সোমবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭

মৃত্যু

মানুষ মৃত্যুর পর মাটিতেই ফেরে,
সে সময় মানুষ আকাশ যার নিচে
তার জন্ম, প্রথম চুম্বন,
রেডউড গাছের বিস্ময়,
শেষ রাখালিয়া বাঁশিটির অন্ধ সুর,
ধূমকেতুর কার্বন, সূক্ষ্ম মৌলকণা।

এভাবেই পত্রহীন শুন্যতার ভেতর শুন্যতা
একদিন সবুজ পাথর; এভাবেই
মানুষের হাত, পা, করোটি খুলে যায়,
মনে পড়ে সমস্ত সমুদ্র,
বালিমাখা তার নামের উপর একটা ঝিনুক,
অন্য ঝিনুকের মতো অথচ সে অন্য ঝিনুকের মতো নয়।

শুধু অতি নিপুণ গাংচিল জানে পতনের মানে,
শুধু মাটি ও সমুদ্র জানে থাকা, না থাকার মানে।

রবিবার, আগস্ট ২৭, ২০১৭

দুই নদীর কথা

পারিবারিক কিংবদন্তী মেনে
গিয়েছি ভূস্বর্গের নদীটির দ্বীপে;
এখানে জঙ্গল কেটে পূর্বজ আমার
স্থাপনা করেছিলেন আরশিনগর;
অবধারিত ইতিহাস বদলানোর বাসনা
ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ পাপ।

নদীটির জলপথ বেয়ে চলে আসি
তার বোন একালের রূপসী নদীটির কাছে।
'ধর্ম বা নরকের ভয় নেই আমার',
সান্ধ্যভাষায় বলে সেই ছিনাল নদী,
তার বুকের গোপন কুঠুরি খুলে
একে একে মেলে ধরে
ভাঙ্গা পাত্র, খন্ডিত কাঁচ, পুরনো প্রদীপ।
'তোমাকেও নিয়ে যাবো একদিন
মোহনার দিকে, চরম আশ্লেষে',
কুয়াশাভরা স্বরে বলে সে।

এক দীর্ঘ জন্ম কেটে গেছে

এক দীর্ঘ জন্ম কেটে গেছে।
তারপর, গল্পচ্ছলে বলে ফেলে তোমার সন্ততি,
'একটু লাজুক আর ভিতু ছিল তো মা সে' বয়সে'।

ঐ রাতে লিখতে পারতাম সবচেয়ে দুঃখী শ্লোক।
আজ তোমার চেহারা জলরঙ-ওয়াশের ছবি।
একটু বাদিকে সিঁথি ছিল, ডান গালে কালো তিল?

জানি অন্তিম বিদায় বলে কিছু নেই,
অদৃশ্য হয় না, বাঁক নেয় মানুষেরা
কিন্তু পরবর্তী মোড় আসবার আগে
এক দীর্ঘ জন্ম কেটে যায় কখনও কখনও।

শুক্রবার, আগস্ট ১৮, ২০১৭

সাপ-লুডু

ছেলেবেলায় এডভেঞ্চারের লোভে বাড়ী থেকে পালিয়ে
চলে গিছলাম বন্ধুহীন, অচেনা শহরে। তখন আমার ভেতর
খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। ইদানীং প্রায় রাতে দুঃস্বপ্নের ভেতর
পালাচ্ছি গোরখপুরের গ্রামে আর হিন্দি কাগজে পড়ছি
নিরুদ্দিষ্টের প্রতি বিজ্ঞাপন। এই যে পালানোর খেলা তারও
নীতিকথা থাকে, যেমন আছে সাপ-লুডুর খেলায়। চিরন্তন
সত্য হল প্রতিটা সিঁড়ির কাছেই লুকিয়ে থাকে সাপ। চলতে
থাকে উঠে যাওয়া, নেমে যাওয়ার খেলা।  সেই নিয়মে শুধু
পালালে চলবে না। জন্তুরাও আত্মরক্ষা বলতে জানে কখনো
লড়াই, কখনো পালানো বা কামোফ্লেজ করে থাকা। এখন
আর পালানোর নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। কেউ শুনছেন?

বুধবার, আগস্ট ০৯, ২০১৭

বৃষ্টির ভেতর মাউথ অর্গান

স্মৃতি রয়ে গেছে বৃষ্টির ভেতর অনেক রকম।
গাছতলায় তোমার অপেক্ষায় গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে
কাদামাখা হয়ে গেছি, ভুল করে রাস্তার লোকেরা
ভেবেছে আমাকে মহা উপদ্রব, গেঁজেল, মাতাল।
💦💦
লুকিয়ে রয়েছে ইন্দ্রিয়চেতনা বৃষ্টির ভেতর।
ফরেস্ট বাংলোর ডাইনিং টেবিলে মিলিত হবার
অদ্ভুত বাসনা ছেড়ে দুইজনে শুয়েছি মেঝেতে,
বৃষ্টির শব্দের সাথে সারারাত, সঙ্গমবিহীন।
💦💦
বৃষ্টির রকমফের আছে, আছে শব্দ, গন্ধ, বর্ণ।
সীগালের কান্না মেশানো বৃষ্টির শব্দের অতলে
ডুবেছি দুজনে নোনা বাতাসে - ডহাণু রোড জানে
এলসেশিয়ানের মতন খুঁড়ে গেছি করতল।
💦💦
অরণ্যের বৃষ্টি শিখিয়েছে প্রকৃত বিদ্যুৎ আছে
তোমার পশ্চাতে, কর্ণমূলে, বৃন্তে, সোনালী আঙ্গুলে।
তাঁবুর উপরে বৃষ্টি দেখিয়েছে প্রকৃত প্রস্তাবে
একমাত্র মাউথ অর্গান পারে আগ্নেয়গিরির
💦💦
লাভা নিয়ন্ত্রণ করে টিপটিপ বৃষ্টিকে তুমুল
করে দিতে। টিনের চালের বৃষ্টি থেকে বাস্তবিক
নাগরিক বৃষ্টি অবধি পৌঁছুতে গেলে মাঝপথে
অজস্র বিদ্যুৎঝড়, অভিঘাত দেখে যেতে হবে।

রবিবার, আগস্ট ০৬, ২০১৭

হোটেল কামাখ্যা

'বিরক্ত করো না' লেখা চিহ্ন ঝুলিয়েছে দরজায়,
ভুলেছে পরদা টেনে দিতে; ভোরে মাতাল বেয়ারা
বুদ্ধিহীন সূর্য ঘরে ঢোকে চওড়া জানালা দিয়ে,
ধাক্কা দেয় ক্রীড়াক্লান্ত মানুষ দুটিকে, গালি খায়।
মানুষীটি হাত রাখে মানুষ-শরীরে, টেনে নেয়
তার কাছে, চড়ে যেতে চায় মত্ত ঢেউয়ের শীর্ষে,
ভুলে যায় প্রাতঃস্নান, নীলাচল, ট্রেনের সময়।

কাল রাতে বুঝি ভর করেছিল কামাখ্যার চাঁদ
হোটেলের কাটাকুটো ঘরে, নারীর ভিক্ষার্থী হয়ে
লোফালুফি করেছিল রেখা, বৃত্ত ও ত্রিভুজ নিয়ে।
মূর্তিহীন গর্ভগৃহ, কামরূপ-দেবী এখানেই।
নীলাচলে কামাখ্যা মন্দির যেন দূর বাতিঘর।
সিল্কের পরদা জুড়ে যায়, অন্ধকার নেমে আসে
জাহাজের ঘরে। জ্বলে ওঠে ফের অদম্য আগুন।

শনিবার, আগস্ট ০৫, ২০১৭

স্বপ্নেরা

আমরা ক্রমশ অর্থহীন হয়ে উঠি,
মাথার ভেতর পুষি বুদ্ধির অগম্য জটিলতা,
শিখে নেই শিকারী কৌশল, কোনোদিন
ঘাতকের চাপাতির অপেক্ষায় থাকি।

বুদ্ধমন্দিরে সহস্র মোমবাতি উজ্বল সন্ধ্যায় -
আমাদের এমন নিভৃত স্বপ্ন নেই।

একটি শিশুর স্বপ্ন বড় সীমাবদ্ধ,
স্বপ্নের ভেতর শিশু গুপ্তহত্যা দেখতে শেখে নি।

আমাদের ঝড়

ঝড়ের সময় মেঘের বিদ্যুৎ, ক্রোধ
ক্রমাগত ক্লান্ত করেছিল আমাদের।

সমুদ্র এখন শান্ত, ডুবা দ্বীপগুলো
ভালোবাসার মতন মাথা চাড়া দেয়।
আমাদের অবুঝ সন্তান মহাপ্লাবনের আগে
নোয়ার জাহাজে নীল বোট-ল্যাম্প হয়ে  
পাখা, ধূলো ঝেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে আসে।
আমরা আবার সেই এজমালি নিশ্চিত জাহাজে।

আমাদের ঝড় উড়ে গেছে।
আসলে গেছে কি?

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ০৩, ২০১৭

তুমি দুঃখ পেলে

যে ছেলেটি কল্পনায় উড়তে শিখেছে, উড়েছিল,
ডানাভাঙা সেই ছেলেটিকে চাও এতদিন পর?
পুরনো ফটোর মতন আবছা, সীসার অক্ষর,
ভাঙা সে যে, ডুবে গেছে তার অশ্রুতে জাহাজ, বহু।

লালিত সংস্কারে শিশু বেছে নেয় খেলনা বন্দুক,
যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা, আত্ম-নিপীড়ন, তেমনি তুমিও
'বিষাদ-সঙ্গীত' নামে শব্দবন্ধটিতে ডুবে গেছো।
কিন্তু তুমি দুঃখ পেলে দুঃখী হয় আমার শহর,
বৈনারীর অনুরোধ নিয়ে আসেনা পাহাড়ী নারী,
উড়ে যায় যাদুবিদ্যার পুস্তক নিস্তব্ধ বাতাসে।

ভাত

আমরা চেয়েছি সাদা ভাত,
একরাশ সাদা জুঁইফুল।
গর্ভিণীর সাধ খাওয়ার মতো নয়,
হাভাতে যেভাবে ভাত খায়
সেভাবে চেয়েছি থালায় আমানি ভাত
লংকাপোড়া, পেঁয়াজের সাথে।

সেরকম থালা থালা ভাত
গোগ্রাসে গেলার পর আমরা বুঝেছি,
প্রয়োজন আমাদের অন্য কিছু ছিল,
আমাদের প্রাপ্য মূল্য আরো বেশী ছিল।

মঙ্গলবার, আগস্ট ০১, ২০১৭

সূর্যমুখী মেয়েটিকে

তোমাকে দেখার পর ঠিকভাবে দেখতে শিখেছি
সূর্যমুখী ক্ষেত, প্রকৃতি, মানুষ, জানোয়ার, সাঁকো,
গাছবাড়ী, লুকোচুরি খেলা, বিকালে হ্যামক-নেশা,
ময়ূরের প্রেম নিবেদন

তোমার সূর্যকে বল, এসব দেখেই মেনে নেই
সরল লাবণ্য সহ উজ্বল হলুদ,
অফুরন্ত দৃষ্টিকোণে দেখা জীবনের বর্ণচ্ছটা,
মানুষের প্রাণে বোনা রৌদ্রদগ্ধ বাদামি মরণ 

শুক্রবার, জুলাই ২৮, ২০১৭

অন্ধকারে অপেক্ষা করছো;
আমি তোমার বাগানে যাব
ঝোপহীন মেরুন বাগানে। 

হিংসা আলোতেও লজ্জাহীন। 
ভালোবাসা শুধু খুঁজে মরে
আড়াল, আবছা অন্ধকার।

মঙ্গলবার, জুলাই ২৫, ২০১৭

মিলোর মর্মর আফ্রোদিতি

বিবর্ণ অপূর্ণ পূর্ণ, মিলোর মর্মর আফ্রোদিতি,
বধির যাজক, প্রায়ান্ধ সার্জেন, প্রেমিক যুবক
তোমার শরীরে ঝুঁকে আছে সুখী বিড়ালের মতো

পরীর উলকি পরে রাজনর্তকীরা নেচেছিল
তোমারই চারপাশে, তোমার বর্তুল, মন্দোদর
দেখে ঈর্ষা করেছিল, চেয়েছিল অনন্ত জীবন

উদর-নর্তকীর মুদ্রার নৃত্যে তোমাকেই দেখে
তোমার রূপের ক্রীতদাস, কবি এটুকু জেনেছে
শরীর পেরিয়ে যে শরীর আছে সে তো কবিতার

সোমবার, জুলাই ২৪, ২০১৭

আগুন

রাতভর দেয়াল-লিখন,
হিম ভোরে, উৎসবে জ্বেলেছি আগুন,
পোড়াব এবার বাস্তিল দুর্গের গেট

উত্তাপ চাওয়া উন্মাদিনী দেখিয়েছে খড়কুটো,
রক্তাক্ত কপাল, ছ্যাঁকা দেয়া স্তন, ধর্ষিত সন্তান

আগুনের নীল ধোঁয়া জানিয়ে দিয়েছে
আজকাল অনেকেই হায়েনার ছাল গায়ে ঘোরে

রবিবার, জুলাই ২৩, ২০১৭

সময়

সময়কে কাঁধে করে ছুটে চলেছি;
কখনো পাগলের মত,
কখনও বেশ সুস্থিরভাবে;
আচমকা শুনতে পাই রাস্তার পাশে
এক বিষণ্ণ বৃদ্ধের গান, 'তব স্মরণখানি
ওগো আমার প্রাণে আজি বাজায় বীণা
মৃদু করুণ তানে'।
হায়, সেই বৃদ্ধ সময়কে বন্দী করে
রাখতে পারেনি, তবু সময়ের বাঘনখ
ভোঁতা করতে চাইছিল,
শেষকালে ঘড়ির কাঁটাকে
ছুড়ে ফেলে দিল আস্তাকুঁড়ে।

সময়কে কাঁধে করে ছুটে চলা কি পরাজয়?

হে শক্তিমান সময়, কিছুই দাওনি তুমি,
এই পরিত্রাণহীন ভাঁড়কে শুধু ফিরিয়ে দাও
সেই দহন, সেই অলৌকিক ভুল।

পিছনে এগিয়ে যান

বাসে 'বেআআলা, বেআআলা' চিৎকার
শুনে কেউ কি বুঝেছে কন্ডাকটর নিজেই এক
সেয়ানা ফেকুর অঙ্গীকার?
সে কেবল গলাবাজি করে,
'পিছনে এগিয়ে যান, পিছনে এগিয়ে...'

কন্ডাকটরের আছে গোপন এজেন্ডা,
বাসে লোক উঠলেই বিনম্র হুঙ্কার,
'পিছনে এগিয়ে যান, অন্ধ অন্ধকারে...'

রোহিপনল

শ্মশানে দাঁড়িয়ে কি সহজ হাসিমুখে বলেছিলে
'মরেও আনন্দ এই পরিচ্ছন্ন সুন্দর শ্মশানে'।
সহসাই চলে যেতে হবে এই ভেবে শ্মশানকে
প্রিয় মনে হয়েছিল? ভেবেছিলে ত্রিভুজ প্রেমের
রসালো কাহিনী শহরে ছড়িয়ে গেলে, প্রতিদিন
খোলামকুঁচির গার্হস্থ্য মিনার ক্লান্তি এনে দেবে?
তার চেয়ে ভালো উজ্বলতাহীন নিঃশল্ক মাছের
মতো শুয়ে ভুলে থাকা প্রেমিকের ধারালো চুম্বন?

তোমার শরীর চুল্লির আগুনে পুড়ে ছাই হলেও
কিছু শোক থেকে যায়; ডোমের গম্ভীর হাত আনে
ছাইমাখা নাভিমূল। 'এই আমার স্ত্রী?' - বিস্ফারিত-
চোখে-প্রশ্ন-করা সাধাসিধে স্বামী একটু পরেই
উষ্ণ লোহা স্পর্শ করে শুদ্ধ হবে, শুধু জানবেনা
কি ছলনা করেছিল স্ত্রীর প্রেমী ও রোহিপনল।

কামরূপে দু'বার

তোমার ভয়েস-মেল শুনেই মুছেছি,
বলেছ, 'তোমাকে মিস করছি, ভীষণ,
মনে পড়ছে সে'সব রাতদিনগুলি'।

এদিকে আবার মন্দির চাতালে এক
গেরুয়া-বসন সাধুর শরীরে লেপ্টে
সেলফি তুলেছ দেখে পিত্তি জ্বলে গেল।

'শালা ভন্ড, কে বলেছে তোকে সাধু হতে?
এখনও রমণীস্পর্শে এত গদগদ
তুই ঈশ্বর খুঁজবি? এতই সহজ?'

সাধু ও ঈশ্বর থাক, বরং আমাদের
রাতদিনগুলি মনে করি, হে ভৈরবী,
তুমিই শিখিয়েছিলে গোপন আনন্দ।

আমার শিক্ষিকাও তুমি সে হিসেবে।
গুরুদক্ষিণায় তোমারই শেখানো বিদ্যা
প্রয়োগ করেছি, তুষ্ট করেছি তোমাকে।

সমস্ত সেলফি, স্বামী, পুত্র ও কন্যার
সাথে - আজ থাক। বরং কাহিনী শোনাও
আমাদের ফটোহীন গোপন রাতের।

চকোলেট

শিবাজী পার্কের ইরানী রেঁস্তোরায় হিপি যুবতীটি চকোলেট খাচ্ছিল।
আদ্দির পাঞ্জাবি-ভেদী ব্রাহীন গোলাপী স্তনদ্বয় দৃশ্যমান দেখে রেঁস্তোরায়
বসা কামকাতর যুবকেরা নানারকম শীৎকারধ্বনি করে স্তনদ্বয়ের প্রতি
তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল। যুবতীটির সঙ্গী জটাজুটধারী শ্বেতাঙ্গ যুবক
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সঙ্গীনির দিকে তাকালে যুবতীটি মুখে এমন তৃপ্তির আভাস ফোটালো
যা কেবল রমনতৃপ্ত, ক্লান্ত, জাগতিক নারীরই মুখেই ফোটে। কামকাতর যুবকদের
শীৎকারধ্বনি থেমে গেল কিন্তু তারা কেউই বুঝতে পারল না এই অপরিচ্ছন্ন নারীর
মুখের উজ্বল আলো কী গত রাতের পরিতৃপ্তির স্মৃতিচারণ নাকি এন্ডোরফিনের খেলা।

সাক্ষাৎকার

মেয়েটির বাম হাতে নীল রঙের উল্কিতে লেখা
SPQR,  বাম স্তনে সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ।
সে জানিয়েছিল তার নাম গিরিজা, উল্কিতে লেখা।
তার রূপমুগ্ধ অশিক্ষিত গ্রামীণ উল্কিওয়ালা
উল্কি এঁকেছিল আর তার প্রেমিক-সাজা দালাল
মেয়েটিকে 'শিক্ষা' দিতে বাম স্তনে ছ্যাঁকা দিয়েছিল।

এসব বলতে গিয়ে মেয়েটি কাঁদে নি। বেপাড়ায়
থাকলেও সে কাগজ পড়ে, টিভির খবর দেখে।
সে জেনেছে এদেশের অনেক মেয়ের চেয়ে ঢের
ভালো আছে সে উল্কির ভুল আর কালো ছ্যাঁকা নিয়ে।

ভাষা

দীর্ঘ কথার পথে প্রয়াস ছিল হোঁচটে
না থামার, তবু থেমেছি ক্লান্ত পদক্ষেপে,
চলেছি আবার ভাষা ও শব্দের তটে।

দীর্ঘ সফেন নীল শব্দের তটে একাকী
হেঁটে জানা গেলো তোমার সাথে অনেক
বোঝাপড়ার পাহাড় রয়ে গেছে বাকী।

চারপাশের দৃশ্য, অল্প বিশ্রামের দাবী
শুইয়েছে আমাকে বালির বিছানায়;
ফেলে আসা দূরপথ অলৌকিক চাবি

দিয়ে খুলে দেখি কোনো সহজ বুলিতে
বোঝাতে পারিনি আমার না বলা কথা।
আমি কি ফিরে যাবো খরোষ্ঠী লিপিতে?

তিনি

তিনি কখনোই কারো প্রণাম নেননা,
কোনো ফুলমালা তাঁর গলায় পৌঁছতে না পেরে
তাঁর হাতে আটকে যায় ও ফিরে আসে স্বস্থানে।

এক ঝকঝকে দিনে, তীর্থমুখে
নিসর্গ দেখে তাঁর মনে পড়লো হুইটম্যান,
মালা পরাতে আসা শিশিরতাজা কিশোরিকে দেখে
অবিচল মনের হিসেবে ভুল হয়ে গেল,
তিনি মালা নিলেন গলায়, গ্রহণ করে ফেললেন প্রণাম।

তিনি কি তখন ভাবছিলেন, এর মত কেউ
হতে পারতো তাঁর নাতনি
অথবা হুইটম্যানের 'ঘাস'?

হ্রদের নিকটে

পূর্ণ পানপাত্র ফেলে কিছু সাঙ্কেতিক তৃষ্ণা নিয়ে
হ্রদের নিকটে গিয়েছিল সুবিনয়,
সেখানে শরীর খুলে জরাগ্রস্ত প্রেতবৃক্ষছায়া
ধীরে কথা বলে নিত্যস্নাত মাছরাঙাটির সঙ্গে।

ব্রোঞ্জের থালার মত সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে
শেষ রৌদ্রস্নান ভুলে ছবি আঁকে গগন পটুয়া
লাল, কমলা, সোনালি রঙে।

অই নির্বস্তুক ছবি দেখে
বালিহাঁসের সুস্বাদু মাংস ভুলে মনে করেছিল কার কথা
প্রয়োগিক সুবিনয়, সে প্রাকসন্ধ্যায়?

মেরেলিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ

ওয়েস্টউড গোরস্থানের সামনে গাইড বলল,
'আপনি ভেতর থেকে ঘুরে আসুন, এ ফাঁকে 
লাঞ্চ সেরে নিচ্ছি আমি'। ফাঁকা গোরস্থান, 
অজস্র কবর, দূরে ঘাস ছাঁটছে, নতুন কবর 
খুঁড়ছে কিছু লোক, আমি খুঁজছি মনরোর কবর। 

হুবহু মেরেলিনের মত এক লাস্যময়ী অদূরে; 
কাছে যেতেই সে যুবতী বলল, 'এই আমার ক্রিপ্ট, 
সবাই দেখতে আসে, সবাই জানতে চায় নগ্ন 
পিন-আপ মেয়ে থেকে শুরু করে পর্দায় আগুন 
জ্বালাতে শিখেছি কিভাবে, শুয়েছিল কিনা জেএফকে 
এক রাত আমার সঙ্গে, কেন ভালোবেসেছিল
ক্যামেরা ও মানুষ আমাকে; সবাই দেখতে চায় 
আমার শাদা পোষাক সাবওয়ে ভেন্টের বাতাসে উড়ছে, 
নগ্ন করে দিচ্ছে আমাকে; পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ 
আমার রহস্যময় যোনির কামনায় কাতরাচ্ছে এখনো, 
এমন কি মৃত্যুর পরেও; এই যে আমার উপরের ক্রিপ্টে 
রিচার্ড পঞ্চের নামে যে বুড়ো তেইশ বছর শুয়েছিল 
আমার উপর সঙ্গমের ভঙ্গিতে উপুড় হয়ে, সিক্, 
তার বৌ নিলামে বেচেছে সে ক্রিপ্ট ছেচল্লিশ লাখ ডলারে; 
এবার যে বাস্টার্ডই শুতে আসুক আমার উপর, 
তার পাছায় লাথি মেরে নিচে ফেলে দেব।'

ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আমি কি স্বপ্ন 
দেখছিলাম না কি এই যুবতী মেরেলিন-ভক্তদের একজন 
যাদের চুম্বনে মেরেলিনের ক্রিপ্টের পাথর গোলাপী হয়েছে।


সম্রাটের আদেশ

আন্তিগোনে ও তার দিদি ইসমেনে কথা বলছিল। 
আমি গ্রীনরুম থেকে গ্রীক সৈন্যের পোশাকে মঞ্চে ঢুকে 
নিজস্ব সংলাপ শুরু করি। দর্শকেরা ধরে নেয় যে ঐ দৃশ্যে 
আমার ভূমিকা আছে, তারা চুপ করে থাকে। আমি বলি, 
'আমি তোমাদের শান্তিভঙ্গ করব না, বিরক্ত করব না। 
দিনপঞ্জীর যে পাতাগুলি উড়িয়েছি ঘাসে, আমি তাদের 
খুঁজতে আসি নি, সে অবিন্যস্ত শব্দগুলো যেখানে যাবার 
সেখানেই উড়ে চলে গেছে। আমি ঘাসের শিশির বা 
জোনাকির জ্বলা-নেভা দেখতে আসি নি, ঝিঁঝিপোকাদের 
ডাক শুনতে আসি নি। আমি বলতে এসেছি সম্রাট ক্রেয়োন 
দেশে নতুন আদেশ জারি করেছেন যে কে কী খাবে সেটা 
সম্রাটই ঠিক করে দেবেন আর সম্রাটের স্তাবকেরা এই 
নতুন আদেশ পালন করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তোমার ছুরি 
দেবে আমাকে, বীর আন্তিগোনে?' 
এর পর নাটকের কুশীলবরা বুঝতে পারে আমি এই নাটকে 
অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। তারা দল বেঁধে মঞ্চে উঠে আসে, আমাকে 
দেশদ্রোহী ঘোষণা করে পেটাতে পেটাতে মঞ্চের বাইরে নিয়ে যায়। 
দর্শকেরা চুপ করে বসে থাকে। 

ব্রততী-দেয়াল কথা

ওই যে ব্রততী জড়িয়ে ধরেছে আমার দেয়াল 
শ্বাসরুদ্ধকারী চরম আশ্লেষে - আসলে ব্রততী
নয়, তুমিই দেয়াল-লতা, দেয়ালও দেয়াল নয়। 

ভূমিকা বদল হবে আজ, তুমিই দেয়াল হবে,
লতার নিঃশব্দ গতিতে তোমার ভিতর দেয়ালে
পুতে দেব জয়ধ্বজা, প্রতিবিম্ব, নতুন জীবন, 

শাশ্বত আগুন, সে আগুন জন্ম দেবে সূর্যকণা। 
সেদিন তদন্ত হবে, কে ব্রততী আর কে দেয়াল, 
ভালবাসার শিকড় কোথায় গিয়েছে, কতদূর। 

ব্রততী ও দেয়ালের ভূমিকা বদল হয় বলে,
দেয়াল ভাঙে না, অহর্নিশ, পানপাত্রের মতন, 
একে অন্যের পরিপূরক থেকে যায় চিরকাল। 

পরিত্যক্ত গির্জায়

পাইনের হাহাকার ঘুরে মরে শূন্য বাতিদানে। 
বাতিল কাঠের দানপাত্রের মতোন 
দিনগুলি, রাতগুলি কাটে। 

প্রার্থনা-বেঞ্চে-খোদাই নামে নীল শ্যাওলা জমেছে, 
যীশু, ক্ষমা করো অসভ্যতা। 
দয়ালু মেরীর মুখে রহস্যের হাসি। 

বন্দনাগানবিহীন জানালার রঙীন শার্সিতে 
অনন্তের গল্প রয়ে গেছে। 

ক্লাসমেট

অনিমেষ অনেক বছর পর নেমে এসেছিল ফ্রান্স থেকে,
যখন মেসোমশাই চলে গিছলেন কষ্ট পেয়ে। 
এবার মাসিমা কফি-টেবিলে কফির মগ হাতে, 
'কাম্য মৃত্যু' - সবাই বলছে।

আমাদের স্কুলজীবনের নানা গল্প, 
'তারপর, সুবল কেমন আছে', 'মোহিত হঠাৎ চলে গেল' -
এইসব অর্থহীন কথা বিনিময় ক্রমশই 
অনভ্যস্ত সঙ্গমের মতো হয়ে উঠে। 
আমরা আড়ষ্টভাবে অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকি খুব, 
এ দেখাই শেষ দেখা - দুজনেই জানি।

দশ বছর

শেষ চুমুর সাথে মেরুন বিকালে
বলেছিলে দেখা হবে দশ বছর পর
আবার, চার নাম্বার রুটের বাসস্টপে,
যেখানে প্রথম বজ্রপাত হয়েছিল।
দশ বছর, হাজার মাইল পেরিয়ে
এসেছি বাসস্টপে, আখরোট রংয়ের
জোব্বা পরা, ধুলোমাখা রাস্তার যাদুকর
ম্যাজিক দেখায় ফুটপাতে, তুমি নেই।

তোমার ফ্ল্যাটে সুরেলা বেল বাজাতেই,
তুমি দরজা খুলে দু'হাতে ঢাকো মুখ,
তারপর প্রশ্ন করো, 'কাকে চাই?'
তোমার দু'চোখ তোমারই দেয়ালের হরিণের
কাচের চোখের মত স্থির, ওই দু'চোখে কোন
স্মৃতি, কামনা, মায়া, টান বা মমতার
লেশ নেই। 'আমার ভুল হয়েছে, ম্যাডাম',
বলতেই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করো তুমি।

দশ বছর কি অনেক, অনেক দীর্ঘ সময়?
সময় যাদুকর কি মুছে দিয়েছে আবেগ?
দশ বছর কাকে নিয়ে বসবাস করেছি আমি?
দরজা খুলে, কেন দু'হাতে ঢেকেছিলে মুখ?
আমার বন্ধুর আছে প্রখর ফেটিশ
মেয়েদের জুতো, পাঁচ নম্বর সাইজ,
জানতে না চাইলেও আমার আরাম কেদারায়
শুয়ে শোনাবে কাহিনী তার।

শুধু নিম্ফোম্যানিয়াকদের সঙ্গে নাকি
আমার বন্ধুর দেখা হয়।
তার গল্প শুনি।

বহুদূরে গিয়েছিল ধূসর সমুদ্র সেদিন

বহুদূরে গিয়েছিল ধূসর সমুদ্র সেদিন,
আশ্রয় খুঁজে খুঁজে অজস্র মরা ঝিনুকের
শেষে আমরা গিয়েছিলাম সমুদ্রের কাছে,
উত্তাল ঢেউয়ে ঘেরা নির্জন পাথরের বুকে।

নরকে যাওয়ার ভয় ছিলনা আমাদের,
রোদ, বৃষ্টি, বাতাসকে গ্রাহ্য করিনি,
এমন উষ্ণ আসব আমরা পাইনি কখনো,
দিনভর তোমার মুখে জেগেছিল বিভা।

হোঁচট খেয়ে পড়েছিলাম সছিদ্র পাথরে,
তুমিই হাত ধরে টেনে তুলেছিলে গূঢ়
জীবনের শেষ ও শুরুর সফেন ঢেউয়ে।
কে বলে সমস্ত স্মৃতিই সতত সুখের?

যুবকেরা

যুবকেরা চেয়েছিলো ঘোরের ভেতর বেঁচে থাকা
এ সত্য জানাও এক মধুর বিভ্রম
বাস্তবে বা ঘোরে বেঁচে থাকা মেঘমালা
নত হয় গলন্ত মোমের মতো মেয়েটির কাছে

সৃষ্টি মানে গেমের সাপের মতো লেজ গিলে নেয়া
বেঁচে থাকা মানে সাপটাকে পুরো গিলে না খাওয়া
এ এক ছলনা, বিভ্রমসঞ্জাত এবং
এ বিভ্রমও একদিন বিস্মৃত,  উদাসী হয়ে যাবে

যুবকেরা ক্রীতদাস হতে চেয়েছিল সূর্যাস্তের
ঢের আগে, নির্জন জখম ভুলে গিয়ে,
একা মেঘবালিকার কাছে
সেও এক মায়াবী বিভ্রম, শুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণ

বিচ্ছিন্ন পংক্তিমালা ১

মধ্যরাতে দরজা ঠোকে কে ঘরে,
'মনু, দরজা খোলো'?
আমাকে তো চেনে না কেউ এ শহরে।

একজন ডাকতো আমাকে এই নামে,
সে তো বহুদিন নেই;
কে এই অদৃশ্য কাঠঠোকরা, মধ্যযামে?

তার পাওয়ার কিছু ছিল না, তোমায় বলি নি,
সবকিছু দান করে সে চলে গেছে কবে,
বরং আমিই ঋণী।

স্বচ্ছ অন্ধকার ছেড়ে কি তবে উঠে আসে
সেই মনু, যে মাহিম খাঁড়িতে একদিন
ভিজেছিল ক্ষুধায়, প্রবাসে?

বিচ্ছিন্ন পংক্তিমালা ৩

চোখের ভেতর অনেক চোখের কোলাজ,
তেলরঙ দৃষ্টিহীন কাঁচের প্যালেটে গড়ায়,
সময় ভেঙ্গে চুরমার করে বুকের পাঁজর।

বৃষ্টির মাঝে চোখ দুটি আরব্য রজনী,
প্রবল বাতাস, অন্ধকারের আশাবরী,
জাফরাণ ভরা নোঙরহীন অজস্র জাহাজ।

চোখ দুটি বেনেবৌ রংয়ের বেনারসী,
গলন্ত কালো নিষ্পাপ চকোলেট।
তবু কেন আমি পাপের সমুদ্রে ডুবি?

আমি সেই নাবিক যে কথা বলে চোখের
ঢেউয়ের সাথে, সমস্ত জীবন চেয়েছি ওরকম
দুটি অপলক আশ্রয়দাত্রী বন্দরের চোখ।

পথের বাঁকে দাড়িয়ে আছে দমকা প্রণয়,
ঘৃণার পতাকা নামাও দয়াময়ী পাতা,
গড়ে তুলি বিমুগ্ধ চোখের কোলাজ।
আজ জোৎস্নারাতে তোমার গানে সমস্ত পরীরা
নতুন মুদ্রায়। ছেঁড়া মেঘেরা মোবাইলের ওয়ালপেপার,
তারা বিশ্বের সমস্ত নিস্তব্ধতা নিয়ে স্থির। তুমি শাওয়ার
চালিয়ে গাইছো, তারপর একা নিজেকেই চেনা।

কাঁটা চামচের চেয়ে হাত ভালো, শুরু করলেই
আঙ্গুলেরা প্রজাপতি তোমার গানের দীপ্ত সুরে।
তারা জানে না কিসের উৎসব। হৃদয়স্পন্দন
বলে এই আধো অন্ধকারে কেউ নিশ্চয় আসবে।

আজ জোৎস্নারাতে তোমার গানে সমস্ত পরীরা
নতুন মুদ্রায়।
এ অলৌকিক ট্ট্রেনের পথ, স্টেশন সবই ধোঁয়াময়। কারা
যাত্রী ছিল আগে, কারা নেমে যাবে কোন নৈঃশব্দের নীচে -
জানা নেই। যে বিবর্ণ কম্পাস পথ দেখাবে বলেছিল সেটা
জুমের পোড়া বাঁশের ছাইয়ে ঢেকে গেছে। দুদিকের গাছগুলি
গান গেয়ে সরে যায়, আমি জেগে থাকার চেষ্টায় একসময়
ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর হয়, দেখি এক শতাব্দী পেরিয়ে গেছে।
কয়েকজন স্কিজোফ্রেনিক 'স্বাধীনতা চাই' বলে চেঁচাচ্ছে।
এ শ্লোগান কয়েক স্টেশন আগেও শুনেছি। পরের গন্তব্য
আসছে, ট্রেন কিছুক্ষণের জন্য ঢুকে যাব কুয়াশার ভেতর,
তবু বার বার ফিরে আসবে আমার জন্মভূমিতে আবহমান
কবিতার ধারাজলের মত, মানুষের কাছে, মানুষের জন্য।

রবিবার, মার্চ ১৯, ২০১৭

ভাঁড়

মহোদয়গণ, যতই রঙীন মুখোশ পরুন, আপনারা
পৃথিবীর নির্জনতম প্রান্তরে আমাকে ঝুলিয়ে
আমার উলঙ্গ দেহে ছুঁড়ে মারছেন থুথু, কাদা,
সুতীব্র প্রলেপ মাখছেন যাতে বোধ জেগে থাকে।

ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা যখন বলেন সমস্বরে,
ওকে দেখতে কি হাস্যকর ছেলেমানুষের মতো,
কিম্বা চোখের ফোয়ারা দেখে হেসে গড়াগড়ি খান,
আপনারা তখন জানতে পারেন না
সত্যি জল গড়াচ্ছে আমার চোখ দিয়ে।

ট্র্যাকটা সংকীর্ণ বলে মালিকের মেয়ে,
ঘোড়া, মায় ছাগল ছানার জন্য রাস্তা ছেড়ে দেই,
আমি, বস্তুত, কিছুই করতে পারি না এর বেশী,
বড় জোর, নতজানু হয়ে প্রার্থনা করতে পারি,
মহোদয়গণ, সমস্ত চেতনা নষ্ট করে আমাকে বোকার
স্বর্গে পৌঁছে দিন, তাড়াতাড়ি।
পঞ্চম বছরে আসে ভোট, ঘুরেফিরে
শ্মশানের নেশারুর মত লাল চোখ,
গর্জন, বর্ষণ, গণিকাতন্ত্রের নাচ,
ঝুলির ভেতর থেকে বেরোয় বেড়াল,
জামার রং জ্বলে গেছে কারো,
শুধু ব্র্যান্ডের লেবেল আছে

সেয়ানা জনতা নাচে যে কোন আসরে,
গোপন রেখেছে কার পতাকা উড়াবে

বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৬, ২০১৭

ডেটলাইন হরিয়ানা

দার্শনিক কুকুরের মতো মাঝপথে বসে আছে
আন্দোলনরত সেনানীরা,
নিলাম হয়েছে স্বাধীনতা।

পেরিয়ে এসেছো চন্দন কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ,
স্তনের মতন কমলার ঘ্রাণ তুলে ধরা নারী?
দেখো এবার আগুন ও রক্তের দাগ, ঘুমচোখে।

আত্মধ্বংসকারী খেয়ালী যুদ্ধের ফাঁকে
আগুনের চারপাশে পরীদের নাচ
তুমি দেখেছিলে, অন্ধকারে?
বৃষ্টির পরেই আয়না হয়েছে রাত,
পা দিয়েছো জলে আর ভেঙ্গে গেছে চাঁদ

বুধবার, মার্চ ১৫, ২০১৭

রাজ্যপাটহীন সম্রাটের হয়ে লড়াই করেছো,
তুমি ভেবেছিলে উনি রাজ্যপাট পেলে
বিনিময়ে সন্মান দেবেন।

বিশ্বস্ত সৈনিক,
কী করে ভুলেছ - সম্রাট জন্মান্ধ, নপুংসকও বটে?

কোন একসময়ে, অতীতে,
সম্রাটের দরবারে বিদূষক ছিল,
সব ভাঁড় আজ পারিষদ হয়ে গেছে।

বুড়ো

বৃদ্ধ তঞ্চক খুলেছে চায়ের দোকান,
পার্কের যুগল, তার নিবিষ্ট গ্রাহক,
মনোযোগে শোনে কবে দুই-তিন-পাঁচে
বুড়ো জিতেছিল তিন তাস,
কিভাবে পরিয়ে টুপি বুড়ো বানিয়েছে
কয়েক হাজার,
কোন সালে, সিনেমায় পেছনের সীটে
কার ব্রায়ে, হোঁ হোঁ, বুড়ো পেয়েছিল তুলো

পরিচিত জন জানে, বুড়ো
ঝোলায় রঙীন শার্ট, হ্যাঙ্গার পেলেই

মঙ্গলবার, মার্চ ১৪, ২০১৭

ঠিকানা বদল

এক বাসা থেকে অন্য বাসা,
এভাবেই দিন কেটে গেছে

বারবার অনিকেত ঠিকানা বদলে
শ্যাওলা জমেনি, যেন গড়ানো পাথর
ঘষা খেতে খেতে হারিয়েছে ভার, উজ্বল হয়েছে

বেলাশেষে ক্লান্তি জেগে উঠে -
এইবার, সাঁই,
শ্যাওলা জমাতে চাই, নিজের বাসায় 

ট্যাঙ্গোর নাচের মতো

যাদুকর, কোন ম্যাজিক জানি না আমি,
শিখি শুধু শব্দের নির্মাণ, রীতিনীতি,
তোমার টুপির কবুতর ছাড়া পেয়ে অসহায়,
কালো আফিমের লোভে যায় না কোথাও

আমার বানানো স্টেজে, আধো অন্ধকারে
জোড়া কবুতর উড়ে গেলে, কারা ওরা
জামার বোতাম খুলে দূর থেকে ডাকে?
ছুঁড়ে ফেলা কবিতার স্কেচ খুঁজে খুঁজে
এখন বুঝেছি, ট্যাঙ্গোর নাচের মতো,
সে আমাকে ছুঁয়ে কেন সরে যায় দূরে

ফেরি করবো ভেবেছি

আমার কবিতা পড়ো না এমন প্রাবল্যে, বলি নি?
যদি শব্দ মনে গেঁথে যায়
উচাটনও অসহ, বলি নি?
কোন কথাই শোন নি, ফলে
উলটে দিয়েছো সাপলুডোর প্রাঙ্গণ,
সন্দেহে ছিঁড়েছো আমাদের ছবিগুলো,
অথচ এমন বসন্ত আসেনি আগে

আবার বসন্ত ফিরে এলে ফেরি করবো ভেবেছি
ওষ্ঠরঞ্জনী, আলতা, ক্লিপ, চুড়ি, ফিতা
তোমার পাড়ায়

সোমবার, মার্চ ১৩, ২০১৭

একাকী সাইপ্রেস

ক্যালিফোর্নিয়ার পেবল-বীচের গ্রানাইট পাহাড়ের গায়ে
পশ্চিমের আইকন সেজে একা দাঁড়িয়ে মন্টেরি সাইপ্রেস।
রোজ তাকে দেখে অসংখ্য মানুষ, তার ছবি তোলে।
আড়াইশ' বছরের এই প্রবীণ সাইপ্রেসের কারণে পেবল-বীচ
এক বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পট। এই সাইপ্রেস আগুণে পুড়েছে,
রৌদ্রে, নোনা বাতাসে জ্বলেছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে, চৌষট্টি বছর
তাকে সোজা রাখতে লোহার তারে বেঁধে রাখা হয়েছে, সে মরে নি।

মরতে চায় না কি সে?
এই প্রশ্নের উত্তর সবাই পায় না,
তার ফিসফিস আক্ষেপ শুনতে পায় শুধু একাকী মানুষ:
"বসন্তে আমার পরাগ-শঙ্কু ফাটলে,
কোনও চারাকে কাছাকাছি
বাঁচতে দেয় না বানিয়ারা, আজ একাকীত্বও বিক্রেয় পসরা।"

কার ঠোঁটে ছিল

ভাঙ্গা হাটের শেডের কাছে এসে থামি, হাড্ডিসার
চায়ের দোকানে ছ'জন হাটুরে গুলতানি মারে,
গরীব চাষীর থেলো হুঁকোতে আমার কেরদানী,
হেটো চাষী হাসে, 'বাবু, বাদ দেন, বেহুদা আকাম'

হুঁকোর মৌতাতে মনে পড়ে কার ঠোঁটে ছিল এরকম স্বাদ,
কিশোর বয়সে তার খোঁজে গেলে মাসী বলেছিল,
'খুঁজছো শান্তাকে? এখানে সবাই শান্তা, বসো বাছা'

রবিবার, মার্চ ১২, ২০১৭

গূঢ় বৃত্ত

এক অভিজ্ঞ ডাইনি গুপ্ত আচার দেখাবে বলে
নিয়ে যায় আমাকে সময় সীমান্তের গূঢ় বৃত্তে,
ধীরে ধীরে অন্য ডাইনিরা অপার্থিব অঙরাখা,
রূপোর পেন্ডেন্ট পরে উপস্থিত ঝাড়ু, যাদুকাঠি,
নোনা জল, গুগগুল, দারুচিনি, যাদু তেল নিয়ে  

ছিঁড়ে ফেলে ডাইনিরা জাগতিক আমার পোষাক
পূত অবগাহনের আগে, দেখি ঢিলে অঙরাখা,
পঞ্চভুজ রপোর পেন্ডেন্ট পরা আমি বাঁধা আছি
নানান শেকড়, সিঁদুর চর্চিত পূজার টেবিলে,
দীর্ঘ মোমবাতি জ্বলে; তেলের প্রলেপ, অমার্জিত
মন্ত্র উচ্চারণ সয়ে শুনি পঞ্চভূতের আহ্বান,
ডাইনিদের সবার চোখের বদলে গুহা দেখি,
ঘুরপথে ভেসে আসে শীৎকার, অশ্লীল কৌতুক

সাধু জনের গীর্জায়

দেবদারু, পাইন, রডোডন্ড্রন ঘেরা
বুড়ো সাধু জনের গীর্জায়,
যীশুকে রক্ষার কেউ নেই খড়্গ হাতে,
দেখা যায় রূপালি তুষাররেখা বিশুদ্ধ বাতাসে

পাদ্রী বলেছিলো, 'মাই সন,
আয়না বেচো না আর অন্ধের শহরে'

শুক্রবার, মার্চ ১০, ২০১৭

শ্রদ্ধাস্পদেষু

মৃদু হেসে আপনি চিবুকে ভাঁজ ফেলে,
সস্নেহে নবীনদের বলেছেন, 'ওহে,
বড়ো পাগলামো করছো, এভাবে কবিতা হয় না'।

আপনি ভালোবাসেন ঘুম,
সেজন্যই নবীনের অস্থিরতা, আবেগ, তীব্রতা
আপনার কাছে পাগলামো মনে হয়।

অথচ এসব আপনাকে বলা বৃথা,
আপনি কি জানেন আপনি ঘুমুতে ভালোবাসেন?

বুধবার, মার্চ ০৮, ২০১৭

শাণিত দুঃখের হাতে

কাউকেই বলা যায় না,
তোমাকেও নয়, গহিন বনের ইউক্যালিপ্টাস

পৃথিবীর পরে অভিমানহীন আমি
তবু জেগে থাকি

অন্তিম আশ্রয়, ধোঁয়াটে করতলের স্বাধীনতা,
তুমি তো অন্তত জানো, উদলা শরীরে
কেন সমুদ্যত নীল অপমান মেখে
উর্দ্ধবাহু, দাঁড়িয়েছি ব্যস্ত চৌমাথায়

মঙ্গলবার, মার্চ ০৭, ২০১৭

ইচ্ছেতালিকা

পুরুষেরা, যারা বেঁকে গেছে তবু স্বপ্নে 
সঙ্গমরত, তাদের শিশ্ন দৃঢ় হোক,
তাদের অজস্র সেক্সি নারীবন্ধু হোক। 

লোকগায়কের গীতে নেচে নেচে যারা 
নিজেদের সুন্দরী কমলা ভেবেছিল, 
সেই সব বিগত যৌবনা নারীদেরও 
নতুন প্রেমিক হোক, অর্গ্যাজম হোক। 

ট্রাম্পের মাথায় ঘন চুল, 
সঙ্গে শুভ বোধোদয় হোক।

জুহু

আজ বিকেলে সমুদ্র অভিমানে দূরে চলে গেছে

'বাসন্তী, মী তুঝায়র প্রেম করতো',
বালিতে এ' কথা লিখে মারাঠী যুবক
চলে যায় দূরে, সমুদ্রের কাছে, একা

ছাইরঙা কাঁকড়ার লোভে
হৃদয় খোঁড়ার মতো করে বালি খোঁড়ে
এক ক্ষিপ্র অ্যালসেসিয়ান,
অজীর্ণ নিরোধ, ভেল, সেওপুরি, বেতো ঘোড়া, উট,
যাদুকর, কুস্তি আর শিশুদের প্রাসাদের মাঝে
এক বিন্দাস রমণী হাঁটে

বিষণ্ণ যুবক সবকিছু থেকে ক্রমাগত দূরে চলে যায়,
একা

চম্পাহাওরে লেবাং বোমানি

নাচনী লো, ভালো লাগে এই নিষ্ঠুর মারণ খেলা,
হেলেনের মেলায় নির্মম তোকে মনে করে কেন
সব আলো দুঃখে নিবে যায়? তবু কেন এত আলো?
কামুক ইন্দ্রেরা সহস্র নয়নে তোকে দেখে নিতে
ঈগলের মত মনে মনে ছিঁড়ে ফেলে আবরণ,
বিন্দাস নারীরা নাচে হৃদয়ের জোয়ারের পাশে,
সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে কাঠির সঙ্কেত অবিরত

নাচনী লো, পারংগম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া সুখ নেই,
তোকে ছাড়া, পতঙ্গের ক্রূর মৃত্যু ছাড়া সুখ নেই,
নাচনী লো, আজ তুই সবকিছু তছনছ কর
আচমকা থেমে যাক মেল ট্রেন অনামা স্টেশনে

কশেরুকা

মোট তেত্রিশটি কশেরুকা আছে মানবশরীরে,
একত্রিত কশেরুকাগুলি তৈরী করে মেরুদন্ড,
অস্থিসন্ধিকে স্থিতিস্থাপক বানায়; এ'টুকু জানি
সবাই, অনেকে যা জানি না তা' হলো কিভাবে খুলে
যায় কশেরুকা। ভয় পাবার ব্যাপার নেই, এই
রোগ প্রধানত অধ্যাপক, কবি ও আমলাকুলে।
ক্ষমতা প্রার্থীরা নীচু হতে হতে খুলে যায় ক্লান্ত
কশেরুকা, তাঁরা প্রভুদেবা হয়ে রাবার-শরীর
দেখিয়ে নাচতে থাকেন মঞ্চের খ্যাতির ছটায়,
আর স্মিতহাস্যে তাল ঠুকে যান রাজামহাশয়।

সমাধি ফলক

ভেসে-আসা কবিতার শেষ পংক্তি নিয়ে
সারাদিন ভূতগ্রস্ত থেকে
চুপচাপ গাল খেতো অপদার্থ, রূঢ় মনিবের।
মুখ খুললেই অধরা শব্দেরা উড়ে যাবে ভেবে
দূর থেকে দেখে যেতো পিঠ চুলকানির আসর।

গুটিকয় অন্ধ বন্ধু ফেলে সেই বোকা
আজ শুয়ে আছে, চুপচাপ, এখানেই। 

সোমবার, মার্চ ০৬, ২০১৭

উজ্বল উদ্ধার

দীপ্র প্রাচীন রোমান সম্রাটদের মূর্তির মত
গ্রহণ করেছো অনুগত প্রজাদের,
প্রশান্ত নিষ্ঠুর মুখে রুমালের গেরোতে বেঁধেছো
নরকরোটি, হলুদ, তামার পয়সা, রৌপ্যমুদ্রা,
বাহাতে সিঁদুর মাখানো অদৈব কুড়ুল আলতো
ছুঁয়ে রাখে উরু, ডান হাতে বরাভয়

তোমার ত্রাণের দীর্ঘ মোমবাতি জ্বালে
কোন সে ঈশ্বরী?

শোক, ভালোবাসা

যে সন্তান কোনদিন তোমার ছিলনা তবু শব্দহীন বাসা বেঁধেছিল,
কোনদিন লাথিও ছোঁড়েনি, সেই রেখে গেছে শুষ্ক জলদাগ,
আট সপ্তাহের স্মৃতি, অবিশ্বাস, ভয়, আনন্দের পূর্বাভাস।
যার জন্মদিন কখনো আসেনি, তার আয়ুর হিসেব করো?
যার আয়ু বাস্তবিক ল্যাবের-পরীক্ষা থেকে, অপক্ব বাবার
আনন্দে-লাফানো, তোমাকে চুম্বন, আলিঙ্গন থেকে শুরু হয়ে
গাইনোর মনিটরে শেষ হয়েছিল - তাকে কত আয়ু দেবে?
ঘুমুতে যাবার আগে আর কতদিন কথা ক'বে শ্রুতিহীন তার সাথে?
শোক, আর কত দীর্ঘ হবে?
ভালোবাসা, কত নিদ্রাহীন?

সে তো যাওয়ার আগে জেনে গিয়েছিল -
কাকে বলে শোক, কাকে বলে ভালোবাসা। 

তিনি

তিনি কখনোই কারো প্রণাম নেননা,
কোনো ফুলমালা তাঁর গলায় পৌঁছতে না পেরে
তাঁর হাতে আটকে যায় ও ফিরে আসে স্বস্থানে।

এক ঝকঝকে দিনে, তীর্থমুখে
নিসর্গ দেখে তাঁর মনে পড়লো হুইটম্যান,
মালা পরাতে আসা শিশিরতাজা কিশোরিকে দেখে
অবিচল মনের হিসেবে ভুল হয়ে গেল,
তিনি মালা নিলেন গলায়, গ্রহণ করে ফেললেন প্রণাম।

তিনি কি তখন ভাবছিলেন, এর মত কেউ
হতে পারতো তাঁর নাতনি
অথবা হুইটম্যানের 'ঘাস'?

দশ বছর

শেষ চুমুর সাথে মেরুন বিকালে
বলেছিলে দেখা হবে দশ বছর পর
আবার, চার নাম্বার রুটের বাসস্টপে,
যেখানে প্রথম বজ্রপাত হয়েছিল।
দশ বছর, হাজার মাইল পেরিয়ে
এসেছি বাসস্টপে, আখরোট রংয়ের
জোব্বা পরা, ধুলোমাখা রাস্তার যাদুকর
ম্যাজিক দেখায় ফুটপাতে, তুমি নেই।

তোমার ফ্ল্যাটে সুরেলা বেল বাজাতেই,
তুমি দরজা খুলে দু'হাতে ঢাকো মুখ,
তারপর প্রশ্ন করো, 'কাকে চাই?'
তোমার দু'চোখ তোমারই দেয়ালের হরিণের
কাচের চোখের মত স্থির, ওই দু'চোখে কোন
স্মৃতি, কামনা, মায়া, টান বা মমতার
লেশ নেই। 'আমার ভুল হয়েছে, ম্যাডাম',
বলতেই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করো তুমি।

দশ বছর কি অনেক, অনেক দীর্ঘ সময়?
সময় যাদুকর কি মুছে দিয়েছে আবেগ?
দশ বছর কাকে নিয়ে বসবাস করেছি আমি?
দরজা খুলে, কেন দু'হাতে ঢেকেছিলে মুখ?

রবিবার, মার্চ ০৫, ২০১৭

বিচ্ছিন্ন পংক্তিমালা ১

মধ্যরাতে দরজা ঠোকে কে ঘরে,
'মনু, দরজা খোলো'?
আমাকে তো চেনে না কেউ এ শহরে।

একজন ডাকতো আমাকে এই নামে,
সে তো বহুদিন নেই;
কে এই অদৃশ্য কাঠঠোকরা, মধ্যযামে?

তার পাওয়ার কিছু ছিল না, তোমায় বলি নি,
সবকিছু দান করে সে চলে গেছে কবে,
বরং আমিই ঋণী।

স্বচ্ছ অন্ধকার ছেড়ে কি তবে উঠে আসে
সেই মনু, যে মাহিম খাঁড়িতে একদিন
ভিজেছিল ক্ষুধায়, প্রবাসে?

মানচিত্র বিষয়ক

আমি তো চেয়েছি আশ্চর্য ভ্রমণ, মানচিত্র নিয়ে
বুড়ি ছোঁয়া নয়, আকাট মূর্খের প্রকৃত সফর
যার পথে জীবনের মতো পদ্মপাতা, শিশুদের,
নারীদের, গাছেদের দেখে অনুভবে খুঁজে পাবো
ভিন্ন কীর্তি নয়, অজানা শহর, তরুণ নির্ঝর,
গুগল ম্যাপের বাইরে একান্ত পথ, অভিজ্ঞান
যা দেখেই চিনে নেব হারানো প্রেমিকা, পূর্বস্মৃতি,
মনে হবে আসতে চেয়েছি এখানেই অবশেষে

বস্তুত যেসব ট্যুরিস্টরা মানচিত্র নিয়ে শুধু
মতলব ভাঁজে, ক্রমাগত মানচিত্র দেগে যায়
তারা এখনো জানেনা নিরাপদ পথ ছেড়ে দিয়ে
ভ্রমণের এক্সটেসি, কাকে বলে গ্রামের ভেতর
পথ ভুলে শিশুদের, নারীদের কাছে ভ্রষ্ট পথ
খুঁজে নিয়ে নিজস্ব গুগল ম্যাপ সৃষ্টি করে নেয়া

অ্যান্টিক দোকানে

অ্যান্টিক দোকানে ছুঁয়ে দেখা মানা আখরোট কাঠের টেবিল,
বেলজিয়াম আয়না, পুরনো পেইন্টিং।
ঝাড়লন্ঠনের নিচে কাঠের সেপাই জানে
ম্যান্ডোলিন, রূপোর বাসন, বুককেসের রহস্য।

কারা যেন কারিগরি করে খুলে নেয় নবজন্ম,
অ্যান্টিক বানায় দোকানের নিচে, হেসে বলে -
'তুমিও তো চেয়েছিলে কারুময় কাশ্মিরী ফরাস,
ভুল রাজ্যপাট'।

আগুন

রাতভর দেয়াল-লিখন,
হিম ভোরে, উৎসবে জ্বেলেছি আগুন,
পোড়াব এবার বাস্তিল দুর্গের গেট

উত্তাপ চাওয়া উন্মাদিনী দেখিয়েছে খড়কুটো,
রক্তাক্ত কপাল, ছ্যাঁকা দেয়া স্তন, ধর্ষিত সন্তান

আগুনের নীল ধোঁয়া জানিয়ে দিয়েছে
আজকাল অনেকেই হায়েনার ছাল গায়ে ঘোরে

ভাত

আমরা চেয়েছি সাদা ভাত,
একরাশ সাদা যুঁইফুল।
গর্ভিণীর সাধ খাওয়ার মতো নয়,
হাভাতে যেভাবে ভাত খায়
সেভাবে চেয়েছি থালায় আমানি ভাত
লংকাপোড়া, পেঁয়াজের সাথে।

সেরকম থালা থালা ভাত
গোগ্রাসে গেলার পর আমরা বুঝেছি,
প্রয়োজন আমাদের অন্য কিছু ছিল,
আমাদের প্রাপ্য মূল্য আরো বেশী ছিল।

হোটেল কামাখ্যা

'বিরক্ত করো না' লেখা চিহ্ন ঝুলিয়েছে দরজায়,
ভুলেছে পরদা টেনে দিতে; ভোরে মাতাল বেয়ারা
বুদ্ধিহীন সূর্য ঘরে ঢোকে চওড়া জানালা দিয়ে,
ধাক্কা দেয় ক্রীড়াক্লান্ত মানুষ দুটিকে, গালি খায়।
মানুষীটি হাত রাখে মানুষ-শরীরে, টেনে নেয়
তার কাছে, চড়ে যেতে চায় মত্ত ঢেউয়ের শীর্ষে,
ভুলে যায় প্রাতঃস্নান, নীলাচল, ট্রেনের সময়।

কাল রাতে বুঝি ভর করেছিল কামাখ্যার চাঁদ
হোটেলের কাটাকুটো ঘরে, নারীর ভিক্ষার্থী হয়ে
লোফালুফি করেছিল রেখা, বৃত্ত ও ত্রিভুজ নিয়ে।
মূর্তিহীন গর্ভগৃহ, কামরূপ-দেবী এখানেই।
নীলাচলে কামাখ্যা মন্দির যেন দূর বাতিঘর।
সিল্কের পরদা জুড়ে যায়, অন্ধকার নেমে আসে
জাহাজের ঘরে। জ্বলে ওঠে ফের অদম্য আগুন।

জোছনার কাছে

জোছনা, আমাকে শেখাবি সাঙ্কেতিক শ্লোক,
গোপন সংগীত, বিষ নামানোর মন্ত্র উচ্চারণ?
নদীর কিনারে তোদের নামহীন নৌকার বহর
উধাও হবার আগে ভুল ঠিকানা খোঁজা লোক

আজ নেচে যাবে তোর সইয়ের মোহক বিবাহে
তোদের একান্ত নাচ, তোর ছিপলি সইয়েরা
সেজেগুজে, কোমরে বিছা, গলায় ইমিটেশন,
খোঁপায় ফুল দিয়ে নাচাবে স্তন ও কোমর

যুবকদের লুব্ধ চোখ ঘুরে ফিরে দেখবে পলকের
উজ্বল উপহার; তোদের মতই আমি রীতিহীন,
শিখে নেব সাপ ও মানুষ বশের তন্ত্রমন্ত্র, প্রেম,
তাবিজ, মায়াজাল, শরীরী ভাষা, চটুল গান,

উল্কির কাজ, সাপ ও দেবীর নাম, নারীর স্তব,
বিরহ, মিলন; সঙ্গে নিলে, যাবো তোদের দলে
মীরপুরের হাট, ঢোঁড়া, ঘরচিতি, লাউডগা,
কালনাগিনীর ঝাঁপি ও ওষুধের ঝোলা নিয়ে

শেখাবি সাপ ধরা ঝোপঝাড়ে, সুরেলা গলার
গান, কিভাবে পেঁচাস তুই কালনাগিনীর দেহ
বাহুতে, গলায়; কিভাবে হাঁটিস তুই দুলিয়ে
কোমর, শিকারী কালনাগিনীর রূপে ও স্বভাবে?

সবুজ শিফন জর্জেট

হেমন্তের দুপুরে বারান্দার দড়িতে ঝুলছে
আমার প্রথম মুখচোরা নিভৃত উপহার,
সবুজ শিফন জর্জেট; উজ্বল শ্যামলিমায়
সে বেরিয়েছে কোন অন্ধ সিন্দুক থেকে,
যেন হলুদ জীর্ণ পাতায় রেঁবোর কবিতা,
নিরিবিলি, তবু একদাপ্রিয় বিস্মৃত সংগীত
হয়ে সে আমার অস্তিত্বের শিকড় নাড়া দেয়,
দেখি সে এখনো মজে আছে নিভৃত গৌরবে;
তাকে প্রশ্ন করি কৌতুহলে, 'গোপন কোঠায়
তোমার সাথে ছিল শাঁখের আংটি, স্মৃতির
করাত?' সে যেন জেগে উঠে দূর স্বপ্ন থেকে,
বলে, 'জানি, তুমি পেরিয়ে এসেছো অনেক
কুয়াশাময় কানা গলি, রণলিপ্সুর মেশিনগান,
ঘুণপোকার তুরুপুণ, অন্ধ নায়কের ছল,
নির্দোষ মানুষের জন্য পাগলাঘন্টি, গোরস্থান,
মৃত শিশু, মানুষের মুখোশে পশুদের নাচ;
আমি তো স্বপ্ন দেখি সূর্যোদয়ের, দূর গোধূলি
বেলায় এক যুবকের সলজ্জ প্রথম প্রেমের।'

আমেদাবাদে, এক নবরাত্রির সন্ধ্যায়

ইলা অরুণের গলা, 'রঙ্গিলো, মারো ঢোলনা'
ছাপিয়ে ডান্ডিয়া কাঠির শব্দ ঝরে অবিরত,
চিকণের চোলি, টুকরো আয়নার  ঘাগরা,
বন্ধনী দোপাট্টার নারীরা ও উজ্বল কেডিয়া,
পাগড়ী পরা যুবকেরা অনলস নাচে উন্মাদ
ঢোলের তালে যেন দ্রুত সুফি নৃত্যের ঘোরে,
যেন পৃথিবীতে শোক, ক্ষুধা, মৃত্যু নেই, নাচ
আছে শুধু অনন্ত যৌবনের কৃষ্ণ ও রাধার।

সহসা লোডশেডিং নামে, দৃশ্যপট বদলায়,
নাচের মাঝে বসা ঢোল, তবলা বাজিয়েদের
হটিয়ে কিছু সঙ্গমক্লান্ত নাবিক ও ক্রীতদাস
মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ায়, ভালোবাসার গান আর
গায়না কেউই, 'মৃত যোদ্ধাদের বিজয়গাঁথায়
কোন গরিমা নেই', ঘোষণা করে ক্রীতদাসের
মোড়ল; যে নারীরা রাধা সেজেছিল তারা নেই
আর, রাধাকে খুঁজি তবু আমি মূঢ় অন্ধকারে।
ছোট বড় নানা লড়াইয়ের শেষে
একাহাতে প্রথম সুটকেস গুছিয়েছে সুমি,
স্পার্টার সরলতায় শুয়ে ভাঙ্গা হারমোনিয়াম

দেয়ালে এখনো সিঁদুর খেলার ছোপ,
ফেলে যাওয়া টিপ সাজের টেবিলে,
রাতের না বলা কথাগুলো ছিটগ্রস্ত চিরকুট
হয়ে ওড়ে, পাখার বাতাসে

মুখোশ

মিথ্যার বেসাতি করে যারা হেঁটে গেছে
সিঁড়ি বেয়ে সাফল্যের দিকে,
তাদের মুখোশ অতি প্রচ্ছন্ন রয়েছে।

ট্যাক্সিড্রাইভার দেখেছিল
রিয়ারভিউ মিররে আমার কাকুতি।
একেই কি প্রেমে পড়া বলে?

জুয়ায় জিতেছে যারা, তারা
সবাই জেনেছে,
আমার অপেরা মুখোশ নিতান্ত অভাবী ভাঁড়ের।
মুখোশ খুলতে গিয়ে দেখি
মুখোশটা মুখ হয়ে গেছে।

প্রেম বসে আছে ক্ষুব্ধ বালকের মতো

প্রেম বসে আছে ক্ষুব্ধ বালকের মতো,
মাথা গুঁজে, এক কোণে। দেরিতে এসেছো।
অনভ্যাসে জীর্ণ খেলা ভুলেছে বালক।
কিভাবে তোমার সাথে ভাববিনিময়
হবে? যতই প্রলুব্ধ করো, হাসিঠাট্টা
করো, বালকের মনে গাঢ় অভিমান -
কেন দেরিতে এসেছো? বালক ভুলেছে
খেলা, তার তীক্ষ্ণ ছুরিতে জং লেগে গেছে।

ক্ষুব্ধ বালকের মতো প্রেম বসে আছে।  

ভিজে বালি পায়ে

কি পাবার আশা করে পান্ডুলিপিহীন, নষ্ট আমি
আবার এসেছি এ নদীতে? অথবা তোমার কাছে?
উত্তেজিত ঠেলা নয় দরজায়, নিঃশব্দে এসেছি
পরিকল্পনাহীন এ রোঁদে।

সব মেধা উবে গেছে মোরাম ছড়ানো পথে, জানি।
একদিন স্তব্ধ হবে জলের সংগীত অন্ধকারে,
থেকে যাবে শুধু ক'টি নুড়ি, সবুজ শেওলাধরা।

সদ্যজাত কাছিম যেভাবে সমুদ্রের দিকে যায়
সেভাবেই চলে যাব ভিজে বালি পায়ে,
অন্ধ আনুগত্যে।

ধরমশালায় সন্ধ্যা

সূর্যাস্তের আগে নোনাধরা দেয়ালে অজস্র ছবি,
সেগুনের দরজায় নখের আঁচড়ে দিনগুলি
আচমকা সন্ধ্যা হয়, কিন্নরের পথহীন বনে
পরিদের চুল পাক খেয়ে লাল কয়লার মেঘ।

বিস্মিত বালক, সূর্যাস্ত দেখতে হেঁটেছো অনেক,
সূর্যাস্তের শূন্যতা ব্যতীত মানুষ সংক্ষিপ্ত হয়,
কাঙরার অনাবিল পটে হাসে কামার্তা রমণী,
ছোট লাসার শিকড়ে ছড়িয়ে পা, গান গায় কেউ,
পাতাগুলো এক একটা পতত্রী হয়ে উড়ে যায়
নামগিয়ালের কিনারে মেঘের সুতীর্থযাত্রায়।

পাইন পাতার শব্দে মৃতদের ঘুম ভেঙে যাবে?
এলগিন, তোমার কবরে কারা ফুল দ্যায় আজ?
গুর্খা নারীদের গান, নাকি মরণের ঘ্রাণ, নাকি
তোমাদের ঘুম খানখান করে তীক্ষ্ণ স্নাইপার?

ধরমশালায় ভোর

তুষারপাতের কথা ছিলনা এখন,
কিছু সুতীব্র উন্মাদ জলকণা ছিল
প্রত্যন্ত দক্ষিণে; কোমল স্ফটিক হিম
ঝাপটে পড়েছে কিন্নরীর ঐ অক্ষত
বুকে; সূর্য লুকিয়েছে ধূসর শোকের
আড়ালে; কিন্নরী ভেবেছিল শোকমেঘ
প্রেম দেবে, ডেকে এনেছিল আরো মেঘ,
পাইনের মাথাগুলি তারা ঢেকেছিল
কুয়াশায়, তবু আশ্চর্য ভোরের আলো
স্থির পায়ে এসেছিল কিন্নরীর কাছে;
রঙীন কাচের ঝরোখা, ক্যালিডোস্কোপ;
কেন কেউই দেখেনি অন্ধত্বের আগে?

দে'জা ভ্যু

লাভার পাথর নয়, তবু এমনই কালোবরণ
পাথরে শুয়েছি একদিন -
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এসে মনে হল।
এমনই ফেনিল জল আত্মধ্বংসকারী
খেলা খেলেছিল একদিন -
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এসে মনে হল।

ঘাসের ঘাগরা পরা কোন হুলা-সুন্দরী ছিল না সে রমণী,
তার বাঞ্জারা ঘাগরা ছিল, গলায় মটরমালা
আর অদৃশ্য বন্ধন ছিল -
এসবই হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এসে মনে হল।

স্কিজোফ্রেনিয়া

সরাসরি কথা বলি আমি পরিচিত ঈশ্বরের সাথে,
এলিয়েন সেজে ঈশ্বর নক্ষত্র থেকে আমাকে দেখেন,
আমি একা হলে কথা বলেন আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ,
মুম্বাইয়ে তাজ হোটেলে অনেক লাশ গড়িয়ে পড়ার পর
আমি দেখি নির্বসনা মাধুরী দীক্ষিত নেচেই চলেছে চাঁদে,
ঈশ্বর নিষ্ঠুর, মাঝরাতে ঘুম থেকে আমাকে উঠিয়ে খেলতে থাকেন,
আমাকে কুকুর বানিয়ে, প্রচুর চেষ্টা করেন আমাকে আত্মঘাতে ঠেলে দিতে,
একবার উনি ধাক্কা দিয়ে আমাকে ফেলেছিলেন বাঁকানো রেললাইনে,
হুঁ হুঁ, এমনি সময়েই আমি ভ্যান গগের ছবির ভেতর লুকিয়ে যাই ...

ব্রততী-দেয়াল কথা

ওই যে ব্রততী জড়িয়ে ধরেছে আমার দেয়াল
শ্বাসরুদ্ধকারী চরম আশ্লেষে - আসলে ব্রততী
নয়, তুমিই দেয়াল-লতা, দেয়ালও দেয়াল নয়।

ভূমিকা বদল হবে আজ, তুমিই দেয়াল হবে,
লতার নিঃশব্দ গতিতে তোমার ভিতর দেয়ালে
পুতে দেব জয়ধ্বজা, প্রতিবিম্ব, নতুন জীবন,

শাশ্বত আগুন, সে আগুন জন্ম দেবে সূর্যকণা।
সেদিন তদন্ত হবে, কে ব্রততী আর কে দেয়াল,
ভালবাসার শিকড় কোথায় গিয়েছে, কতদূর।

এই সব লোকেরা

প্রখর যৌবনে ভালোবেসে বান্ধবীর চুলে ফুল
লাগায়নি তারা, দেয়নি ফাইন কোন পুষ্পোদ্যানে,
হিংসুটে বেড়াল কিম্বা হিংস্র কুত্তা পোষেনি কখনো,
সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে করেনি কাউকে তিরস্কার,
মিচকে হাসিতে সমস্যাকে পাঠিয়েছে আপোষের ঘরে।

বটের ঝুরির মতো অচপল মুখ নিয়ে ঘোরা
লোকেরা গোপন রাখে নিত্য কুৎসিত অস্ত্রশস্ত্র,
ভিন্ন কন্ঠস্বর এলে এরা মানুষের পিতৃনাম
'খগেন' বানিয়ে দেয়, ভোট নিয়ে, আইনমাফিক পথে, এবং
কুকুরকে পেটানোর আগে তাকে ঠিক পাগল ঘোষণা করে।

একদিন মুড়ি, চানাচুর, বিড়ি ভাগ করে খাওয়া লোকেরা
ফেলে এসেছে চায়ের আধা কাপ অনেক পেছনে।

একা

শস্যহীন মাঠে হাঁটে একাকী যুবক,
সে জেনেছে ভালোবাসা ভালো,
অলীক ভালোবাসার চেয়ে আরো ভালো
বন্ধুহীন, দীর্ঘপথ একা হেঁটে চলা...

কবিপত্নী

শুধু শালগম, ময়দার অদ্ভুত ডিনার শেষে
কবি লিখে গেছে, রাতভর।
নাদেঝদা, পদ্যগুলো তুমি নকল করেছো, মুখস্ত করেছো,
সেলাই করেছো বালিশের খোলে, লুকিয়ে রেখেছো সসপ্যানে,
অন্ধকারে কবিকে জড়িয়ে ধরে সাহস দিয়েছো,
সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ গুপ্ত পুলিশের নয়,
এই যে লিফট থেমে গেল - মত্ত পড়শী এসেছে।

শহরের পর শহর পেরিয়ে গিয়ে
পদ্য বিলিয়েছ, উঁহু, পদ্য নয়, নিষিদ্ধ মাদক।
অনেকেই মরে যেতো, তুমি কেন এতো বেঁচে ছিলে?

অনেক কবির মতোই অবিশ্বাসী, স্বেচ্ছাচারী কবি
তোমার রান্নাকে ঘেন্না করেও
তোমাকে অদ্ভুত রকমের 'বেসেছিল।
কবিরা কী এরকমই হয়?

আজও অন্ধকার নামে, সঙ্গে ধুলোমাখা প্রশ্নেরাও -
অনেকেই মরে যেতো, তুমি কেন এতো বেঁচে ছিলে?
বলতেই হয়,
নিষিদ্ধ মাদক ছাড়া আমরা কীভাবে জানতাম -
কবিতাকে কেন ভয় পায় কিছু লোক,
কবিতা লেখার জন্য কেন মরে যায় কিছু লোক? 

মেরেলিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ

ওয়েস্টউড গোরস্থানের সামনে গাইড বলল,
'আপনি ভেতর থেকে ঘুরে আসুন, এ ফাঁকে
লাঞ্চ সেরে নিচ্ছি আমি'। ফাঁকা গোরস্থান,
অজস্র কবর, দূরে ঘাস ছাঁটছে, নতুন কবর
খুঁড়ছে কিছু লোক, আমি খুঁজছি মনরোর কবর।

হুবহু মেরেলিনের মত এক লাস্যময়ী অদূরে;
কাছে যেতেই সে যুবতী বলল, 'এই আমার ক্রিপ্ট,
সবাই দেখতে আসে, সবাই জানতে চায় নগ্ন
পিন-আপ মেয়ে থেকে শুরু করে পর্দায় আগুন
জ্বালাতে শিখেছি কিভাবে, শুয়েছিল কিনা জেএফকে
এক রাত আমার সঙ্গে, কেন ভালোবেসেছিল
ক্যামেরা ও মানুষ আমাকে; সবাই দেখতে চায়
আমার শাদা পোষাক সাবওয়ে ভেন্টের বাতাসে উড়ছে,
নগ্ন করে দিচ্ছে আমাকে; পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ
আমার রহস্যময় যোনির কামনায় কাতরাচ্ছে এখনো,
এমন কি মৃত্যুর পরেও; এই যে আমার উপরের ক্রিপ্টে
রিচার্ড পঞ্চের নামে যে বুড়ো তেইশ বছর শুয়েছিল
আমার উপর সঙ্গমের ভঙ্গিতে উপুড় হয়ে, সিক্,
তার বৌ নিলামে বেচেছে সে ক্রিপ্ট ছেচল্লিশ লাখ ডলারে;
এবার যে বাস্টার্ডই শুতে আসুক আমার উপর,
তার পাছায় লাথি মেরে নিচে ফেলে দেব।'

না, এই দীর্ঘ বক্তৃতার পর মেরেলিন অদৃশ্য হয় নি।
ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আমি কি স্বপ্ন
দেখছিলাম না কি এই যুবতী মেরেলিন-ভক্তদের একজন
যাদের চুম্বনে মেরেলিনের ক্রিপ্টের পাথর গোলাপী হয়েছে। 

সম্রাটের আদেশ

আন্তিগোনে ও তার দিদি ইসমেনে কথা বলছিল।
আমি গ্রীনরুম থেকে গ্রীক সৈন্যের পোশাকে মঞ্চে ঢুকে
নিজস্ব সংলাপ শুরু করি। দর্শকেরা ধরে নেয় যে ঐ দৃশ্যে
আমার ভূমিকা আছে, তারা চুপ করে থাকে। আমি বলি,
'আমি তোমাদের শান্তিভঙ্গ করব না, বিরক্ত করব না।
দিনপঞ্জীর যে পাতাগুলি উড়িয়েছি ঘাসে, আমি তাদের
খুঁজতে আসি নি, সে অবিন্যস্ত শব্দগুলো যেখানে যাবার
সেখানেই উড়ে চলে গেছে। আমি ঘাসের শিশির বা
জোনাকির জ্বলা-নেভা দেখতে আসি নি, ঝিঁঝিপোকাদের
ডাক শুনতে আসি নি। আমি বলতে এসেছি সম্রাট ক্রেয়োন
দেশে নতুন আদেশ জারি করেছেন যে কে কী খাবে সেটা
সম্রাটই ঠিক করে দেবেন আর সম্রাটের স্তাবকেরা এই
নতুন আদেশ পালন করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তোমার ছুরি
দেবে আমাকে, বীর আন্তিগোনে?'
এর পর নাটকের কুশীলবরা বুঝতে পারে আমি এই নাটকে
অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। তারা দল বেঁধে মঞ্চে উঠে আসে, আমাকে
দেশদ্রোহী ঘোষণা করে পেটাতে পেটাতে মঞ্চের বাইরে নিয়ে যায়।
দর্শকেরা চুপ করে বসে থাকে। 

শাহেনশাহের কাছে আর্জি

আপনার সুদীর্ঘ উজ্বল সাদা জোব্বায়, হুজুর,
এক ফোটা অপযশ নেই; অশেষতত্বজ্ঞ স্যার,
আপনি যে কোন দাওয়াত-এ আড্ডার মধ্যমণি,
আমরা আহাম্মকের দল ঠান্ডা জল দিয়ে গিলি
আপনার শ্রীমুখ নিসৃত মাখনের মত বাণী,
আপনার সৃষ্ট অস্থায়ী, অন্তরা, আভোগের সুরে
বেতালা গাইবে যে জাহিল তার বে-কাফন লাশ
ছিঁড়ে খাক জংলী কুত্তা এবং টেকো শকুনের দল।

হুজুর, আদতে আপনার মহান সন্দর্ভ বিনা
আমরা উজবুকরা কিভাবে জানতে পারতাম,
আপনি সলোমনের চেয়েও অনেক বেশী জ্ঞানী,
আপনি সাহসী ডেভিডের চেয়েও অনেক বেশী,
আপনি স্যামসনের চেয়েও অনেক শক্তিশালী,
লিঙ্কনের চেয়েও অনেক বেশী বুদ্ধি আপনার,
আপনি সিকান্দরের চেয়েও অনেক সুকৌশলী,
আপনি গুয়েভারার চেয়ে বড় ভাবুক বিপ্লবী।

হুজুর, আমরা জানি এ মুল্লুকে উন্নতির পিছে
আপনার করিশমা; এ তল্লাটে সমস্ত মঞ্জিল,
সেতু, উড়ানপুলের নক্শা হুজুরের করসৃষ্ট;
সাহিত্য শিল্পের গুণীরা ঘুরছে হুজুরের পিছে;
অঞ্চলের সব শল্যবিদ হুজুরকে মানে গুরু;
মুরুব্বিদের হুজুর জ্ঞান দেন ইনসানিয়াত
প্রসঙ্গে ও ক্লাবের শিবিরে হুজুর মেহেরবান
অপোগন্ড দেখলেই নেন তাঁর আলিশান কোলে।

হুজুর, গুস্তাখী মাফ্, আপনার কাছে আর্জি এই-
হুজুরের অনুরাগী কতিপয় আপনার মূর্তি
বসাতে চাইছে শহরের খুব ব্যস্ত চৌমাথায়;
হুজুরের মূর্তি আমাদের শান্তি দেবে অতিশয়,
হুজুরের বরাঙ্গের উপর থাকবে মর্মরের
চন্দ্রাতপ; ব্রহ্মতালু ও ছত্রের ব্যবধান হবে
চৌদ্দ দশমিক তিন সেমি, যাতে কোন দুষ্ট কাক
না পায় মূর্তিকে দূষিত করার সামান্য সুযোগ।

এক দীর্ঘ জন্ম কেটে গেছে

এক দীর্ঘ জন্ম কেটে গেছে।
তারপর, গল্পচ্ছলে বলে ফেলে তোমার সন্ততি,
'একটু লাজুক আর ভিতু ছিল তো মা সে' বয়সে'।

ঐ রাতে লিখতে পারতাম সবচেয়ে দুঃখী শ্লোক।
আজ তোমার চেহারা জলরঙ-ওয়াশের ছবি।
একটু বাদিকে সিঁথি ছিল, ডান গালে কালো তিল?

জানি অন্তিম বিদায় বলে কিছু নেই,
অদৃশ্য হয় না, বাঁক নেয় মানুষেরা
কিন্তু পরবর্তী মোড় আসবার আগে
এক দীর্ঘ জন্ম কেটে যায় কখনও কখনও। 

সাপলুডোর রহস্য

আমাকে বধির ভেবে বলে গেছ যা তা
চুপচাপ আমিও হেসেছি
তোমার সুতোর লুকানো মাঞ্জায় কেটে গেছে গলা
যেন কিছুই হয় নি - মাথা উঁচু করে হেঁটে গেছি
বোটা ব্যাগে ভরে নিয়েছি পানীয়, দীর্ঘ পথ আর
এক ভয়ংকর নদীকে পেরিয়ে যেতে হবে বলে

আজ মাথা নিচু করে একা হেঁটে যাও
লোকেরা তোমাকে দেখে ফুট বদলায়

সাপলুডোর রহস্য আজও রহস্যই রয়ে গেল 

জেন সন্ন্যাসী ও গুহাচিত্র

ছবি আঁকতে শিখি নি আমি কোনদিন।
দেখা হল জেন সন্ন্যাসীর সঙ্গে গ্রামের সীমায়,
গ্রামটি পেরিয়ে সাধু আমাকে দিলেন এক স্লেট,
'আঁকো, যে ভাবনা আসে মনে'।

এঁকে চলি অতর্কিতে প্যালিওলিথিক গুহাচিত্র,
হরিণ শিকারে সাফল্য কামনা, ষাঁড়ের লড়াই,
বা' হাতের ছাপ, পত্নী, পুত্র, কন্যা, মানব জীবন।

জেন সন্ন্যাসী হাসেন, 'যেতে দাও এঁকেছো যা কিছু',
হাত বোলাতেই স্লেট থেকে মুছে যায় সব ছবি।
সাধু আবার হাসেন, 'যেতে দেয়া শেখো'। 

পক্ষীরাজ

আমার একটা পক্ষীরাজ ঘোড়া হওয়ার ইচ্ছে ছিল।
বন্ধুরা বলল, 'পক্ষীরাজ ঘোড়া শুধুই কল্পকথার।
তুই কি করে পক্ষীরাজ ঘোড়া হবি, গাধা কোথাকার?'
কিন্তু আমি জানি পক্ষীরাজ আছে তার স্বাধীনতা ও
শক্তি নিয়ে এই পৃথিবীতে। আমার স্ত্রী বললেন,
'তোমার মতলব খুব বুঝি। এ বয়সেও উড়ে বেড়াবার সখ?
ডানা কেটে দেব।'

খবর পেয়ে পাড়ার লোক্যাল কমিটির দাদা এলেন,
'এ কী শুনছি? আপনার নাকি পক্ষীরাজ ঘোড়া
হওয়ার সখ হয়েছে? চালাকি? সব খবর রাখি,
আপনি আমেরিকা থেকে ড্রোন আনাচ্ছেন
আমাদের উপর নজরদারী চালাতে। জানেন না
আমাদের ক্ষমতা। এই যে আপনার যাকে আপনি
মেরুদন্ড বলে জানেন তা আসলে একটা জিপার।
এটা খুলে দিলে কী হয় দেখুন।' একথা বলেই দাদা
মেরুদন্ডে টান দিতেই ওটা হুঁশ করে খুলে গেল,
আমি এলিয়ে পড়লাম হাওয়া-ছাড়া বেলুনের মত
আর ভাবতে থাকলাম, 'তাহলে ম্যাজিক ও স্বপ্ন
বলে কিছু নেই?' 

পরিত্যক্ত গির্জায়

পাইনের হাহাকার ঘুরে মরে শূন্য বাতিদানে।
বাতিল কাঠের দানপাত্রের মতোন
দিনগুলি, রাতগুলি কাটে।

প্রার্থনা-বেঞ্চে-খোদাই নামে নীল শ্যাওলা জমেছে,
যীশু, ক্ষমা করো অসভ্যতা।
দয়ালু মেরীর মুখে রহস্যের হাসি।

বন্দনাগানবিহীন জানালার রঙীন শার্সিতে
অনন্তের গল্প রয়ে গেছে।