শুক্রবার, জুলাই ২৮, ২০১৭

অন্ধকারে অপেক্ষা করছো;
আমি তোমার বাগানে যাব
ঝোপহীন মেরুন বাগানে। 

হিংসা আলোতেও লজ্জাহীন। 
ভালোবাসা শুধু খুঁজে মরে
আড়াল, আবছা অন্ধকার।

মঙ্গলবার, জুলাই ২৫, ২০১৭

মিলোর মর্মর আফ্রোদিতি

বিবর্ণ অপূর্ণ পূর্ণ, মিলোর মর্মর আফ্রোদিতি,
বধির যাজক, প্রায়ান্ধ সার্জেন, প্রেমিক যুবক
তোমার শরীরে ঝুঁকে আছে সুখী বিড়ালের মতো

পরীর উলকি পরে রাজনর্তকীরা নেচেছিল
তোমারই চারপাশে, তোমার বর্তুল, মন্দোদর
দেখে ঈর্ষা করেছিল, চেয়েছিল অনন্ত জীবন

উদর-নর্তকীর মুদ্রার নৃত্যে তোমাকেই দেখে
তোমার রূপের ক্রীতদাস, কবি এটুকু জেনেছে
শরীর পেরিয়ে যে শরীর আছে সে তো কবিতার

সোমবার, জুলাই ২৪, ২০১৭

আগুন

রাতভর দেয়াল-লিখন,
হিম ভোরে, উৎসবে জ্বেলেছি আগুন,
পোড়াব এবার বাস্তিল দুর্গের গেট

উত্তাপ চাওয়া উন্মাদিনী দেখিয়েছে খড়কুটো,
রক্তাক্ত কপাল, ছ্যাঁকা দেয়া স্তন, ধর্ষিত সন্তান

আগুনের নীল ধোঁয়া জানিয়ে দিয়েছে
আজকাল অনেকেই হায়েনার ছাল গায়ে ঘোরে

রবিবার, জুলাই ২৩, ২০১৭

সময়

সময়কে কাঁধে করে ছুটে চলেছি;
কখনো পাগলের মত,
কখনও বেশ সুস্থিরভাবে;
আচমকা শুনতে পাই রাস্তার পাশে
এক বিষণ্ণ বৃদ্ধের গান, 'তব স্মরণখানি
ওগো আমার প্রাণে আজি বাজায় বীণা
মৃদু করুণ তানে'।
হায়, সেই বৃদ্ধ সময়কে বন্দী করে
রাখতে পারেনি, তবু সময়ের বাঘনখ
ভোঁতা করতে চাইছিল,
শেষকালে ঘড়ির কাঁটাকে
ছুড়ে ফেলে দিল আস্তাকুঁড়ে।

সময়কে কাঁধে করে ছুটে চলা কি পরাজয়?

হে শক্তিমান সময়, কিছুই দাওনি তুমি,
এই পরিত্রাণহীন ভাঁড়কে শুধু ফিরিয়ে দাও
সেই দহন, সেই অলৌকিক ভুল।

পিছনে এগিয়ে যান

বাসে 'বেআআলা, বেআআলা' চিৎকার
শুনে কেউ কি বুঝেছে কন্ডাকটর নিজেই এক
সেয়ানা ফেকুর অঙ্গীকার?
সে কেবল গলাবাজি করে,
'পিছনে এগিয়ে যান, পিছনে এগিয়ে...'

কন্ডাকটরের আছে গোপন এজেন্ডা,
বাসে লোক উঠলেই বিনম্র হুঙ্কার,
'পিছনে এগিয়ে যান, অন্ধ অন্ধকারে...'

রোহিপনল

শ্মশানে দাঁড়িয়ে কি সহজ হাসিমুখে বলেছিলে
'মরেও আনন্দ এই পরিচ্ছন্ন সুন্দর শ্মশানে'।
সহসাই চলে যেতে হবে এই ভেবে শ্মশানকে
প্রিয় মনে হয়েছিল? ভেবেছিলে ত্রিভুজ প্রেমের
রসালো কাহিনী শহরে ছড়িয়ে গেলে, প্রতিদিন
খোলামকুঁচির গার্হস্থ্য মিনার ক্লান্তি এনে দেবে?
তার চেয়ে ভালো উজ্বলতাহীন নিঃশল্ক মাছের
মতো শুয়ে ভুলে থাকা প্রেমিকের ধারালো চুম্বন?

তোমার শরীর চুল্লির আগুনে পুড়ে ছাই হলেও
কিছু শোক থেকে যায়; ডোমের গম্ভীর হাত আনে
ছাইমাখা নাভিমূল। 'এই আমার স্ত্রী?' - বিস্ফারিত-
চোখে-প্রশ্ন-করা সাধাসিধে স্বামী একটু পরেই
উষ্ণ লোহা স্পর্শ করে শুদ্ধ হবে, শুধু জানবেনা
কি ছলনা করেছিল স্ত্রীর প্রেমী ও রোহিপনল।

কামরূপে দু'বার

তোমার ভয়েস-মেল শুনেই মুছেছি,
বলেছ, 'তোমাকে মিস করছি, ভীষণ,
মনে পড়ছে সে'সব রাতদিনগুলি'।

এদিকে আবার মন্দির চাতালে এক
গেরুয়া-বসন সাধুর শরীরে লেপ্টে
সেলফি তুলেছ দেখে পিত্তি জ্বলে গেল।

'শালা ভন্ড, কে বলেছে তোকে সাধু হতে?
এখনও রমণীস্পর্শে এত গদগদ
তুই ঈশ্বর খুঁজবি? এতই সহজ?'

সাধু ও ঈশ্বর থাক, বরং আমাদের
রাতদিনগুলি মনে করি, হে ভৈরবী,
তুমিই শিখিয়েছিলে গোপন আনন্দ।

আমার শিক্ষিকাও তুমি সে হিসেবে।
গুরুদক্ষিণায় তোমারই শেখানো বিদ্যা
প্রয়োগ করেছি, তুষ্ট করেছি তোমাকে।

সমস্ত সেলফি, স্বামী, পুত্র ও কন্যার
সাথে - আজ থাক। বরং কাহিনী শোনাও
আমাদের ফটোহীন গোপন রাতের।

চকোলেট

শিবাজী পার্কের ইরানী রেঁস্তোরায় হিপি যুবতীটি চকোলেট খাচ্ছিল।
আদ্দির পাঞ্জাবি-ভেদী ব্রাহীন গোলাপী স্তনদ্বয় দৃশ্যমান দেখে রেঁস্তোরায়
বসা কামকাতর যুবকেরা নানারকম শীৎকারধ্বনি করে স্তনদ্বয়ের প্রতি
তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল। যুবতীটির সঙ্গী জটাজুটধারী শ্বেতাঙ্গ যুবক
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সঙ্গীনির দিকে তাকালে যুবতীটি মুখে এমন তৃপ্তির আভাস ফোটালো
যা কেবল রমনতৃপ্ত, ক্লান্ত, জাগতিক নারীরই মুখেই ফোটে। কামকাতর যুবকদের
শীৎকারধ্বনি থেমে গেল কিন্তু তারা কেউই বুঝতে পারল না এই অপরিচ্ছন্ন নারীর
মুখের উজ্বল আলো কী গত রাতের পরিতৃপ্তির স্মৃতিচারণ নাকি এন্ডোরফিনের খেলা।

সাক্ষাৎকার

মেয়েটির বাম হাতে নীল রঙের উল্কিতে লেখা
SPQR,  বাম স্তনে সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ।
সে জানিয়েছিল তার নাম গিরিজা, উল্কিতে লেখা।
তার রূপমুগ্ধ অশিক্ষিত গ্রামীণ উল্কিওয়ালা
উল্কি এঁকেছিল আর তার প্রেমিক-সাজা দালাল
মেয়েটিকে 'শিক্ষা' দিতে বাম স্তনে ছ্যাঁকা দিয়েছিল।

এসব বলতে গিয়ে মেয়েটি কাঁদে নি। বেপাড়ায়
থাকলেও সে কাগজ পড়ে, টিভির খবর দেখে।
সে জেনেছে এদেশের অনেক মেয়ের চেয়ে ঢের
ভালো আছে সে উল্কির ভুল আর কালো ছ্যাঁকা নিয়ে।

ভাষা

দীর্ঘ কথার পথে প্রয়াস ছিল হোঁচটে
না থামার, তবু থেমেছি ক্লান্ত পদক্ষেপে,
চলেছি আবার ভাষা ও শব্দের তটে।

দীর্ঘ সফেন নীল শব্দের তটে একাকী
হেঁটে জানা গেলো তোমার সাথে অনেক
বোঝাপড়ার পাহাড় রয়ে গেছে বাকী।

চারপাশের দৃশ্য, অল্প বিশ্রামের দাবী
শুইয়েছে আমাকে বালির বিছানায়;
ফেলে আসা দূরপথ অলৌকিক চাবি

দিয়ে খুলে দেখি কোনো সহজ বুলিতে
বোঝাতে পারিনি আমার না বলা কথা।
আমি কি ফিরে যাবো খরোষ্ঠী লিপিতে?

তিনি

তিনি কখনোই কারো প্রণাম নেননা,
কোনো ফুলমালা তাঁর গলায় পৌঁছতে না পেরে
তাঁর হাতে আটকে যায় ও ফিরে আসে স্বস্থানে।

এক ঝকঝকে দিনে, তীর্থমুখে
নিসর্গ দেখে তাঁর মনে পড়লো হুইটম্যান,
মালা পরাতে আসা শিশিরতাজা কিশোরিকে দেখে
অবিচল মনের হিসেবে ভুল হয়ে গেল,
তিনি মালা নিলেন গলায়, গ্রহণ করে ফেললেন প্রণাম।

তিনি কি তখন ভাবছিলেন, এর মত কেউ
হতে পারতো তাঁর নাতনি
অথবা হুইটম্যানের 'ঘাস'?

হ্রদের নিকটে

পূর্ণ পানপাত্র ফেলে কিছু সাঙ্কেতিক তৃষ্ণা নিয়ে
হ্রদের নিকটে গিয়েছিল সুবিনয়,
সেখানে শরীর খুলে জরাগ্রস্ত প্রেতবৃক্ষছায়া
ধীরে কথা বলে নিত্যস্নাত মাছরাঙাটির সঙ্গে।

ব্রোঞ্জের থালার মত সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে
শেষ রৌদ্রস্নান ভুলে ছবি আঁকে গগন পটুয়া
লাল, কমলা, সোনালি রঙে।

অই নির্বস্তুক ছবি দেখে
বালিহাঁসের সুস্বাদু মাংস ভুলে মনে করেছিল কার কথা
প্রয়োগিক সুবিনয়, সে প্রাকসন্ধ্যায়?

মেরেলিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ

ওয়েস্টউড গোরস্থানের সামনে গাইড বলল,
'আপনি ভেতর থেকে ঘুরে আসুন, এ ফাঁকে 
লাঞ্চ সেরে নিচ্ছি আমি'। ফাঁকা গোরস্থান, 
অজস্র কবর, দূরে ঘাস ছাঁটছে, নতুন কবর 
খুঁড়ছে কিছু লোক, আমি খুঁজছি মনরোর কবর। 

হুবহু মেরেলিনের মত এক লাস্যময়ী অদূরে; 
কাছে যেতেই সে যুবতী বলল, 'এই আমার ক্রিপ্ট, 
সবাই দেখতে আসে, সবাই জানতে চায় নগ্ন 
পিন-আপ মেয়ে থেকে শুরু করে পর্দায় আগুন 
জ্বালাতে শিখেছি কিভাবে, শুয়েছিল কিনা জেএফকে 
এক রাত আমার সঙ্গে, কেন ভালোবেসেছিল
ক্যামেরা ও মানুষ আমাকে; সবাই দেখতে চায় 
আমার শাদা পোষাক সাবওয়ে ভেন্টের বাতাসে উড়ছে, 
নগ্ন করে দিচ্ছে আমাকে; পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ 
আমার রহস্যময় যোনির কামনায় কাতরাচ্ছে এখনো, 
এমন কি মৃত্যুর পরেও; এই যে আমার উপরের ক্রিপ্টে 
রিচার্ড পঞ্চের নামে যে বুড়ো তেইশ বছর শুয়েছিল 
আমার উপর সঙ্গমের ভঙ্গিতে উপুড় হয়ে, সিক্, 
তার বৌ নিলামে বেচেছে সে ক্রিপ্ট ছেচল্লিশ লাখ ডলারে; 
এবার যে বাস্টার্ডই শুতে আসুক আমার উপর, 
তার পাছায় লাথি মেরে নিচে ফেলে দেব।'

ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আমি কি স্বপ্ন 
দেখছিলাম না কি এই যুবতী মেরেলিন-ভক্তদের একজন 
যাদের চুম্বনে মেরেলিনের ক্রিপ্টের পাথর গোলাপী হয়েছে।


সম্রাটের আদেশ

আন্তিগোনে ও তার দিদি ইসমেনে কথা বলছিল। 
আমি গ্রীনরুম থেকে গ্রীক সৈন্যের পোশাকে মঞ্চে ঢুকে 
নিজস্ব সংলাপ শুরু করি। দর্শকেরা ধরে নেয় যে ঐ দৃশ্যে 
আমার ভূমিকা আছে, তারা চুপ করে থাকে। আমি বলি, 
'আমি তোমাদের শান্তিভঙ্গ করব না, বিরক্ত করব না। 
দিনপঞ্জীর যে পাতাগুলি উড়িয়েছি ঘাসে, আমি তাদের 
খুঁজতে আসি নি, সে অবিন্যস্ত শব্দগুলো যেখানে যাবার 
সেখানেই উড়ে চলে গেছে। আমি ঘাসের শিশির বা 
জোনাকির জ্বলা-নেভা দেখতে আসি নি, ঝিঁঝিপোকাদের 
ডাক শুনতে আসি নি। আমি বলতে এসেছি সম্রাট ক্রেয়োন 
দেশে নতুন আদেশ জারি করেছেন যে কে কী খাবে সেটা 
সম্রাটই ঠিক করে দেবেন আর সম্রাটের স্তাবকেরা এই 
নতুন আদেশ পালন করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তোমার ছুরি 
দেবে আমাকে, বীর আন্তিগোনে?' 
এর পর নাটকের কুশীলবরা বুঝতে পারে আমি এই নাটকে 
অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। তারা দল বেঁধে মঞ্চে উঠে আসে, আমাকে 
দেশদ্রোহী ঘোষণা করে পেটাতে পেটাতে মঞ্চের বাইরে নিয়ে যায়। 
দর্শকেরা চুপ করে বসে থাকে। 

ব্রততী-দেয়াল কথা

ওই যে ব্রততী জড়িয়ে ধরেছে আমার দেয়াল 
শ্বাসরুদ্ধকারী চরম আশ্লেষে - আসলে ব্রততী
নয়, তুমিই দেয়াল-লতা, দেয়ালও দেয়াল নয়। 

ভূমিকা বদল হবে আজ, তুমিই দেয়াল হবে,
লতার নিঃশব্দ গতিতে তোমার ভিতর দেয়ালে
পুতে দেব জয়ধ্বজা, প্রতিবিম্ব, নতুন জীবন, 

শাশ্বত আগুন, সে আগুন জন্ম দেবে সূর্যকণা। 
সেদিন তদন্ত হবে, কে ব্রততী আর কে দেয়াল, 
ভালবাসার শিকড় কোথায় গিয়েছে, কতদূর। 

ব্রততী ও দেয়ালের ভূমিকা বদল হয় বলে,
দেয়াল ভাঙে না, অহর্নিশ, পানপাত্রের মতন, 
একে অন্যের পরিপূরক থেকে যায় চিরকাল। 

পরিত্যক্ত গির্জায়

পাইনের হাহাকার ঘুরে মরে শূন্য বাতিদানে। 
বাতিল কাঠের দানপাত্রের মতোন 
দিনগুলি, রাতগুলি কাটে। 

প্রার্থনা-বেঞ্চে-খোদাই নামে নীল শ্যাওলা জমেছে, 
যীশু, ক্ষমা করো অসভ্যতা। 
দয়ালু মেরীর মুখে রহস্যের হাসি। 

বন্দনাগানবিহীন জানালার রঙীন শার্সিতে 
অনন্তের গল্প রয়ে গেছে। 

ক্লাসমেট

অনিমেষ অনেক বছর পর নেমে এসেছিল ফ্রান্স থেকে,
যখন মেসোমশাই চলে গিছলেন কষ্ট পেয়ে। 
এবার মাসিমা কফি-টেবিলে কফির মগ হাতে, 
'কাম্য মৃত্যু' - সবাই বলছে।

আমাদের স্কুলজীবনের নানা গল্প, 
'তারপর, সুবল কেমন আছে', 'মোহিত হঠাৎ চলে গেল' -
এইসব অর্থহীন কথা বিনিময় ক্রমশই 
অনভ্যস্ত সঙ্গমের মতো হয়ে উঠে। 
আমরা আড়ষ্টভাবে অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকি খুব, 
এ দেখাই শেষ দেখা - দুজনেই জানি।

দশ বছর

শেষ চুমুর সাথে মেরুন বিকালে
বলেছিলে দেখা হবে দশ বছর পর
আবার, চার নাম্বার রুটের বাসস্টপে,
যেখানে প্রথম বজ্রপাত হয়েছিল।
দশ বছর, হাজার মাইল পেরিয়ে
এসেছি বাসস্টপে, আখরোট রংয়ের
জোব্বা পরা, ধুলোমাখা রাস্তার যাদুকর
ম্যাজিক দেখায় ফুটপাতে, তুমি নেই।

তোমার ফ্ল্যাটে সুরেলা বেল বাজাতেই,
তুমি দরজা খুলে দু'হাতে ঢাকো মুখ,
তারপর প্রশ্ন করো, 'কাকে চাই?'
তোমার দু'চোখ তোমারই দেয়ালের হরিণের
কাচের চোখের মত স্থির, ওই দু'চোখে কোন
স্মৃতি, কামনা, মায়া, টান বা মমতার
লেশ নেই। 'আমার ভুল হয়েছে, ম্যাডাম',
বলতেই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করো তুমি।

দশ বছর কি অনেক, অনেক দীর্ঘ সময়?
সময় যাদুকর কি মুছে দিয়েছে আবেগ?
দশ বছর কাকে নিয়ে বসবাস করেছি আমি?
দরজা খুলে, কেন দু'হাতে ঢেকেছিলে মুখ?
আমার বন্ধুর আছে প্রখর ফেটিশ
মেয়েদের জুতো, পাঁচ নম্বর সাইজ,
জানতে না চাইলেও আমার আরাম কেদারায়
শুয়ে শোনাবে কাহিনী তার।

শুধু নিম্ফোম্যানিয়াকদের সঙ্গে নাকি
আমার বন্ধুর দেখা হয়।
তার গল্প শুনি।

বহুদূরে গিয়েছিল ধূসর সমুদ্র সেদিন

বহুদূরে গিয়েছিল ধূসর সমুদ্র সেদিন,
আশ্রয় খুঁজে খুঁজে অজস্র মরা ঝিনুকের
শেষে আমরা গিয়েছিলাম সমুদ্রের কাছে,
উত্তাল ঢেউয়ে ঘেরা নির্জন পাথরের বুকে।

নরকে যাওয়ার ভয় ছিলনা আমাদের,
রোদ, বৃষ্টি, বাতাসকে গ্রাহ্য করিনি,
এমন উষ্ণ আসব আমরা পাইনি কখনো,
দিনভর তোমার মুখে জেগেছিল বিভা।

হোঁচট খেয়ে পড়েছিলাম সছিদ্র পাথরে,
তুমিই হাত ধরে টেনে তুলেছিলে গূঢ়
জীবনের শেষ ও শুরুর সফেন ঢেউয়ে।
কে বলে সমস্ত স্মৃতিই সতত সুখের?

যুবকেরা

যুবকেরা চেয়েছিলো ঘোরের ভেতর বেঁচে থাকা
এ সত্য জানাও এক মধুর বিভ্রম
বাস্তবে বা ঘোরে বেঁচে থাকা মেঘমালা
নত হয় গলন্ত মোমের মতো মেয়েটির কাছে

সৃষ্টি মানে গেমের সাপের মতো লেজ গিলে নেয়া
বেঁচে থাকা মানে সাপটাকে পুরো গিলে না খাওয়া
এ এক ছলনা, বিভ্রমসঞ্জাত এবং
এ বিভ্রমও একদিন বিস্মৃত,  উদাসী হয়ে যাবে

যুবকেরা ক্রীতদাস হতে চেয়েছিল সূর্যাস্তের
ঢের আগে, নির্জন জখম ভুলে গিয়ে,
একা মেঘবালিকার কাছে
সেও এক মায়াবী বিভ্রম, শুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণ

বিচ্ছিন্ন পংক্তিমালা ১

মধ্যরাতে দরজা ঠোকে কে ঘরে,
'মনু, দরজা খোলো'?
আমাকে তো চেনে না কেউ এ শহরে।

একজন ডাকতো আমাকে এই নামে,
সে তো বহুদিন নেই;
কে এই অদৃশ্য কাঠঠোকরা, মধ্যযামে?

তার পাওয়ার কিছু ছিল না, তোমায় বলি নি,
সবকিছু দান করে সে চলে গেছে কবে,
বরং আমিই ঋণী।

স্বচ্ছ অন্ধকার ছেড়ে কি তবে উঠে আসে
সেই মনু, যে মাহিম খাঁড়িতে একদিন
ভিজেছিল ক্ষুধায়, প্রবাসে?

বিচ্ছিন্ন পংক্তিমালা ৩

চোখের ভেতর অনেক চোখের কোলাজ,
তেলরঙ দৃষ্টিহীন কাঁচের প্যালেটে গড়ায়,
সময় ভেঙ্গে চুরমার করে বুকের পাঁজর।

বৃষ্টির মাঝে চোখ দুটি আরব্য রজনী,
প্রবল বাতাস, অন্ধকারের আশাবরী,
জাফরাণ ভরা নোঙরহীন অজস্র জাহাজ।

চোখ দুটি বেনেবৌ রংয়ের বেনারসী,
গলন্ত কালো নিষ্পাপ চকোলেট।
তবু কেন আমি পাপের সমুদ্রে ডুবি?

আমি সেই নাবিক যে কথা বলে চোখের
ঢেউয়ের সাথে, সমস্ত জীবন চেয়েছি ওরকম
দুটি অপলক আশ্রয়দাত্রী বন্দরের চোখ।

পথের বাঁকে দাড়িয়ে আছে দমকা প্রণয়,
ঘৃণার পতাকা নামাও দয়াময়ী পাতা,
গড়ে তুলি বিমুগ্ধ চোখের কোলাজ।
আজ জোৎস্নারাতে তোমার গানে সমস্ত পরীরা
নতুন মুদ্রায়। ছেঁড়া মেঘেরা মোবাইলের ওয়ালপেপার,
তারা বিশ্বের সমস্ত নিস্তব্ধতা নিয়ে স্থির। তুমি শাওয়ার
চালিয়ে গাইছো, তারপর একা নিজেকেই চেনা।

কাঁটা চামচের চেয়ে হাত ভালো, শুরু করলেই
আঙ্গুলেরা প্রজাপতি তোমার গানের দীপ্ত সুরে।
তারা জানে না কিসের উৎসব। হৃদয়স্পন্দন
বলে এই আধো অন্ধকারে কেউ নিশ্চয় আসবে।

আজ জোৎস্নারাতে তোমার গানে সমস্ত পরীরা
নতুন মুদ্রায়।
এ অলৌকিক ট্ট্রেনের পথ, স্টেশন সবই ধোঁয়াময়। কারা
যাত্রী ছিল আগে, কারা নেমে যাবে কোন নৈঃশব্দের নীচে -
জানা নেই। যে বিবর্ণ কম্পাস পথ দেখাবে বলেছিল সেটা
জুমের পোড়া বাঁশের ছাইয়ে ঢেকে গেছে। দুদিকের গাছগুলি
গান গেয়ে সরে যায়, আমি জেগে থাকার চেষ্টায় একসময়
ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর হয়, দেখি এক শতাব্দী পেরিয়ে গেছে।
কয়েকজন স্কিজোফ্রেনিক 'স্বাধীনতা চাই' বলে চেঁচাচ্ছে।
এ শ্লোগান কয়েক স্টেশন আগেও শুনেছি। পরের গন্তব্য
আসছে, ট্রেন কিছুক্ষণের জন্য ঢুকে যাব কুয়াশার ভেতর,
তবু বার বার ফিরে আসবে আমার জন্মভূমিতে আবহমান
কবিতার ধারাজলের মত, মানুষের কাছে, মানুষের জন্য।