রবিবার, আগস্ট ২৭, ২০১৭

দুই নদীর কথা

পারিবারিক কিংবদন্তী মেনে
গিয়েছি ভূস্বর্গের নদীটির দ্বীপে;
এখানে জঙ্গল কেটে পূর্বজ আমার
স্থাপনা করেছিলেন আরশিনগর;
অবধারিত ইতিহাস বদলানোর বাসনা
ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ পাপ।

নদীটির জলপথ বেয়ে চলে আসি
তার বোন একালের রূপসী নদীটির কাছে।
'ধর্ম বা নরকের ভয় নেই আমার',
সান্ধ্যভাষায় বলে সেই ছিনাল নদী,
তার বুকের গোপন কুঠুরি খুলে
একে একে মেলে ধরে
ভাঙ্গা পাত্র, খন্ডিত কাঁচ, পুরনো প্রদীপ।
'তোমাকেও নিয়ে যাবো একদিন
মোহনার দিকে, চরম আশ্লেষে',
কুয়াশাভরা স্বরে বলে সে।

এক দীর্ঘ জন্ম কেটে গেছে

এক দীর্ঘ জন্ম কেটে গেছে।
তারপর, গল্পচ্ছলে বলে ফেলে তোমার সন্ততি,
'একটু লাজুক আর ভিতু ছিল তো মা সে' বয়সে'।

ঐ রাতে লিখতে পারতাম সবচেয়ে দুঃখী শ্লোক।
আজ তোমার চেহারা জলরঙ-ওয়াশের ছবি।
একটু বাদিকে সিঁথি ছিল, ডান গালে কালো তিল?

জানি অন্তিম বিদায় বলে কিছু নেই,
অদৃশ্য হয় না, বাঁক নেয় মানুষেরা
কিন্তু পরবর্তী মোড় আসবার আগে
এক দীর্ঘ জন্ম কেটে যায় কখনও কখনও।

শুক্রবার, আগস্ট ১৮, ২০১৭

সাপ-লুডু

ছেলেবেলায় এডভেঞ্চারের লোভে বাড়ী থেকে পালিয়ে
চলে গিছলাম বন্ধুহীন, অচেনা শহরে। তখন আমার ভেতর
খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। ইদানীং প্রায় রাতে দুঃস্বপ্নের ভেতর
পালাচ্ছি গোরখপুরের গ্রামে আর হিন্দি কাগজে পড়ছি
নিরুদ্দিষ্টের প্রতি বিজ্ঞাপন। এই যে পালানোর খেলা তারও
নীতিকথা থাকে, যেমন আছে সাপ-লুডুর খেলায়। চিরন্তন
সত্য হল প্রতিটা সিঁড়ির কাছেই লুকিয়ে থাকে সাপ। চলতে
থাকে উঠে যাওয়া, নেমে যাওয়ার খেলা।  সেই নিয়মে শুধু
পালালে চলবে না। জন্তুরাও আত্মরক্ষা বলতে জানে কখনো
লড়াই, কখনো পালানো বা কামোফ্লেজ করে থাকা। এখন
আর পালানোর নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। কেউ শুনছেন?

বুধবার, আগস্ট ০৯, ২০১৭

বৃষ্টির ভেতর মাউথ অর্গান

স্মৃতি রয়ে গেছে বৃষ্টির ভেতর অনেক রকম।
গাছতলায় তোমার অপেক্ষায় গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে
কাদামাখা হয়ে গেছি, ভুল করে রাস্তার লোকেরা
ভেবেছে আমাকে মহা উপদ্রব, গেঁজেল, মাতাল।
💦💦
লুকিয়ে রয়েছে ইন্দ্রিয়চেতনা বৃষ্টির ভেতর।
ফরেস্ট বাংলোর ডাইনিং টেবিলে মিলিত হবার
অদ্ভুত বাসনা ছেড়ে দুইজনে শুয়েছি মেঝেতে,
বৃষ্টির শব্দের সাথে সারারাত, সঙ্গমবিহীন।
💦💦
বৃষ্টির রকমফের আছে, আছে শব্দ, গন্ধ, বর্ণ।
সীগালের কান্না মেশানো বৃষ্টির শব্দের অতলে
ডুবেছি দুজনে নোনা বাতাসে - ডহাণু রোড জানে
এলসেশিয়ানের মতন খুঁড়ে গেছি করতল।
💦💦
অরণ্যের বৃষ্টি শিখিয়েছে প্রকৃত বিদ্যুৎ আছে
তোমার পশ্চাতে, কর্ণমূলে, বৃন্তে, সোনালী আঙ্গুলে।
তাঁবুর উপরে বৃষ্টি দেখিয়েছে প্রকৃত প্রস্তাবে
একমাত্র মাউথ অর্গান পারে আগ্নেয়গিরির
💦💦
লাভা নিয়ন্ত্রণ করে টিপটিপ বৃষ্টিকে তুমুল
করে দিতে। টিনের চালের বৃষ্টি থেকে বাস্তবিক
নাগরিক বৃষ্টি অবধি পৌঁছুতে গেলে মাঝপথে
অজস্র বিদ্যুৎঝড়, অভিঘাত দেখে যেতে হবে।

রবিবার, আগস্ট ০৬, ২০১৭

হোটেল কামাখ্যা

'বিরক্ত করো না' লেখা চিহ্ন ঝুলিয়েছে দরজায়,
ভুলেছে পরদা টেনে দিতে; ভোরে মাতাল বেয়ারা
বুদ্ধিহীন সূর্য ঘরে ঢোকে চওড়া জানালা দিয়ে,
ধাক্কা দেয় ক্রীড়াক্লান্ত মানুষ দুটিকে, গালি খায়।
মানুষীটি হাত রাখে মানুষ-শরীরে, টেনে নেয়
তার কাছে, চড়ে যেতে চায় মত্ত ঢেউয়ের শীর্ষে,
ভুলে যায় প্রাতঃস্নান, নীলাচল, ট্রেনের সময়।

কাল রাতে বুঝি ভর করেছিল কামাখ্যার চাঁদ
হোটেলের কাটাকুটো ঘরে, নারীর ভিক্ষার্থী হয়ে
লোফালুফি করেছিল রেখা, বৃত্ত ও ত্রিভুজ নিয়ে।
মূর্তিহীন গর্ভগৃহ, কামরূপ-দেবী এখানেই।
নীলাচলে কামাখ্যা মন্দির যেন দূর বাতিঘর।
সিল্কের পরদা জুড়ে যায়, অন্ধকার নেমে আসে
জাহাজের ঘরে। জ্বলে ওঠে ফের অদম্য আগুন।

শনিবার, আগস্ট ০৫, ২০১৭

স্বপ্নেরা

আমরা ক্রমশ অর্থহীন হয়ে উঠি,
মাথার ভেতর পুষি বুদ্ধির অগম্য জটিলতা,
শিখে নেই শিকারী কৌশল, কোনোদিন
ঘাতকের চাপাতির অপেক্ষায় থাকি।

বুদ্ধমন্দিরে সহস্র মোমবাতি উজ্বল সন্ধ্যায় -
আমাদের এমন নিভৃত স্বপ্ন নেই।

একটি শিশুর স্বপ্ন বড় সীমাবদ্ধ,
স্বপ্নের ভেতর শিশু গুপ্তহত্যা দেখতে শেখে নি।

আমাদের ঝড়

ঝড়ের সময় মেঘের বিদ্যুৎ, ক্রোধ
ক্রমাগত ক্লান্ত করেছিল আমাদের।

সমুদ্র এখন শান্ত, ডুবা দ্বীপগুলো
ভালোবাসার মতন মাথা চাড়া দেয়।
আমাদের অবুঝ সন্তান মহাপ্লাবনের আগে
নোয়ার জাহাজে নীল বোট-ল্যাম্প হয়ে  
পাখা, ধূলো ঝেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে আসে।
আমরা আবার সেই এজমালি নিশ্চিত জাহাজে।

আমাদের ঝড় উড়ে গেছে।
আসলে গেছে কি?

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ০৩, ২০১৭

তুমি দুঃখ পেলে

যে ছেলেটি কল্পনায় উড়তে শিখেছে, উড়েছিল,
ডানাভাঙা সেই ছেলেটিকে চাও এতদিন পর?
পুরনো ফটোর মতন আবছা, সীসার অক্ষর,
ভাঙা সে যে, ডুবে গেছে তার অশ্রুতে জাহাজ, বহু।

লালিত সংস্কারে শিশু বেছে নেয় খেলনা বন্দুক,
যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা, আত্ম-নিপীড়ন, তেমনি তুমিও
'বিষাদ-সঙ্গীত' নামে শব্দবন্ধটিতে ডুবে গেছো।
কিন্তু তুমি দুঃখ পেলে দুঃখী হয় আমার শহর,
বৈনারীর অনুরোধ নিয়ে আসেনা পাহাড়ী নারী,
উড়ে যায় যাদুবিদ্যার পুস্তক নিস্তব্ধ বাতাসে।

ভাত

আমরা চেয়েছি সাদা ভাত,
একরাশ সাদা জুঁইফুল।
গর্ভিণীর সাধ খাওয়ার মতো নয়,
হাভাতে যেভাবে ভাত খায়
সেভাবে চেয়েছি থালায় আমানি ভাত
লংকাপোড়া, পেঁয়াজের সাথে।

সেরকম থালা থালা ভাত
গোগ্রাসে গেলার পর আমরা বুঝেছি,
প্রয়োজন আমাদের অন্য কিছু ছিল,
আমাদের প্রাপ্য মূল্য আরো বেশী ছিল।

মঙ্গলবার, আগস্ট ০১, ২০১৭

সূর্যমুখী মেয়েটিকে

তোমাকে দেখার পর ঠিকভাবে দেখতে শিখেছি
সূর্যমুখী ক্ষেত, প্রকৃতি, মানুষ, জানোয়ার, সাঁকো,
গাছবাড়ী, লুকোচুরি খেলা, বিকালে হ্যামক-নেশা,
ময়ূরের প্রেম নিবেদন

তোমার সূর্যকে বল, এসব দেখেই মেনে নেই
সরল লাবণ্য সহ উজ্বল হলুদ,
অফুরন্ত দৃষ্টিকোণে দেখা জীবনের বর্ণচ্ছটা,
মানুষের প্রাণে বোনা রৌদ্রদগ্ধ বাদামি মরণ